মৃিশল্পের চিরকালীন মহিমা

ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির দেশ আমাদের এই বাংলাদেশ। জগৎ বিখ্যাত সোনালি আঁশ, রুপালি ইলিশ, ঢাকাই মসলিন ও জামদানি, টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি, মিরপুরের বেনারসি, বগুড়ার দই, বাঘাবাড়ির ঘি, নাটোরের কাঁচা গোল্লা, ধামরাইয়ের তামা-কাসা ও মৃিশল্পসহ আরও কত কি! সবই এই রূপসী বাংলার ঐতিহ্য। এছাড়াও শ্যামল বাংলায় রয়েছে নানা ঐহিত্যের ইতিহাস।

একসময় গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে ব্যবহার করা হতো মাটির তৈরি তৈজসপত্র। গ্রামের দু-চারটি অবস্থাশালী পরিবার মাটির তৈজসপত্রের পাশাপাশি ব্যবহার করত তামা বা কাঁসা। মাটির তৈজসপত্র তৈরির কারিগরকে বলা হয় কুম্ভকার বা কুমার বা পাল। আর এ শিল্পটির নাম মৃিশল্প। আগের দিনে রান্না করা হতো মাটির হাঁড়ি বা পাতিলে। পানি রাখা হতো মাটির কলসিতে। খাওয়া হতো মাটির থালা বা সানকিতে। সেকালে ফ্রিজ ছিল না। পানি রাখা হতো বেলে মাটির কলসে। পেটের পীড়া বা ব্যথা উপশম করতে মাটির কলসের নিচের ঠান্ডা মাটির প্রলেপ দিতে নিজ চোখে দেখেছি। মাটির তৈজসপত্র ব্যবহার কমার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নানা রকম অসুস্থতা।

মাটির হাঁড়ি-পাতিলে রান্না করা খাবারের স্বাদই আলাদা। মাটির পাতিলে আঁচ দেওয়া হলদেটে দুধের কথা মনে হলে এখনো জল আসে জিভে। বর্তমানেও বাজারে মাটির পাতিলের দইয়ের মূল্য প্লাস্টিকের পাত্রের দইয়ের তুলনায় বেশি! স্বাদও আলাদা! মৃিশল্পের তৈরি জিনিসপত্র কেবল শিল্পই নয়, মৃিশল্প বাঙালি সংস্কৃতিরও একটা অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু সেই মৃিশল্প আজ হারাতে বসেছে।

দেশজুড়ে রয়েছে আমাদের মৃিশল্পীরা। কথা হয় রাজধানীর অদূরে ধামরাইসহ বিভিন্ন এলাকার মৃিশল্পীদের সঙ্গে। জানা যায়, আগের দিনে লেখাপড়ার তেমন সুযোগ ছিল না। তাই স্কুলে যাওয়া আর মাটির কাজ শেখা শুরু হতো প্রায় একই সঙ্গে। প্রথমে নানা রকমনের খেলনা ও ছোটখাটো জিনিস বানানোর মধ্য দিয়ে মাটির কাজের শুরু। কিছু দিন পরেই লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যেত। পুরোপুরিভাবে জড়িয়ে পড়তে হতো মৃিশল্পের সঙ্গে। জীবন কেটে যেত মাটির কাজ করে। শিশুদের যে বয়সটা খেলাধুলা করে পার করার কথা সে সময়টা কাটিয়ে দিত মাটির কাজ করে। আসলে তখনকার পরিবেশটাই ছিল এমন। মাটির খেলনা, ছোটখাটো জিনিসপত্র বানানোটাই ছিল আমাদের খেলা। এতে দু’পয়সা আয়ও হতো। তখন সিলভার, প্লাস্টিক, মেলামাইনের জিনিসপত্র ছিল না। তাই সাংসারিক কাজের জন্য মাটির তৈজসপত্রের চাহিদা ছিল খুব বেশি। কিন্তু এখন আর সেই চাহিদা নেই।

কুমারদের অবস্থা কখনো তেমন স্বচ্ছল ছিল না। ‘মাটির তৈজসপত্র তৈরির যন্ত্রপাতি খুব সাধারণ ও সস্তা। প্রধান যন্ত্র হলো গরুর গাড়ির চাকার মতো চাক। চাকের নিচে তেঁতুল কাঠের সার লাগিয়ে শিল পাথরের উপর স্থাপন করে একটি লাঠি দিয়ে ঘুরানো হয় চাকাটিকে। মাটির পাত্রকে পিটিয়ে প্রয়োজনমতো প্রসারিত করার কাঠের তৈরি যন্ত্রটির নাম ‘পিতনী’। পেটানোর সময় ভিতরের দিকে যে যন্ত্র দিয়ে চাপ দেওয়া হয় তার নাম ‘বইলা’। এটি মাটির তৈরি ও উত্তলাকার। চাকের উপর যার মধ্যে মাটি রেখে পাত্র বানানো হয় হয় তাকে বলে ‘পাড়া’। নকশা করতে হাতুড়ির মতো একটি যন্ত্র ব্যবহার করা হয় যার নাম ‘ফুল্যা’। মাটির জিনিস পোড়ানোর চুলার নাম ‘পুইন’। আগেও এসব যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। এখনো ব্যবহার করা হয়। মৃিশল্পের ক্ষেত্রে খুব একটা উন্নত যন্ত্রের আবির্ভাব হয়নি। তেমন প্রয়োজনও হয় না। বর্তমানে কোথাও কোথাও বৈদ্যুতিক চাক ব্যবহার করা হলেও বৈদ্যুতিক চাকের মাধ্যমে সব তৈজসপত্র তৈরি করা সম্ভব নয়। এসব যন্ত্র বিশেষ কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। হাতের কাজ করতেই হয়।’

মাটির দাম বেড়ে গেছে। প্রয়োজনীয় মাটি এবং তৈরিকৃত সামগ্রী সংরক্ষণ ও শুকানোর জায়গার অভাব, পোড়ানোর জন্য জ্বালানির অভাব কুমারদের প্রধান সমস্যা। দাম বাড়লেও চাহিদা কমে যাওয়ায় মাটির জিনিস বিক্রি করে সংসার চালানো দায়। মাটির জিনিস ব্যবহারের উপকারিতা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করে মাটির জিনিসের চাহিদা সৃষ্টি করতে পারলে মৃিশল্পীরা উপকৃত হবে।

জীবনযাত্রার মান ও ধারা পরিবর্তন, কম খরচে টেকসই ও আরামদায়ক দ্রব্যসামগ্রীর আবিষ্কার ও ব্যবহার, ভোক্তার রুচির পরিবর্তনের ফলে এ শিল্প বিলুপ্তির পথে। তবে মাটির জিনিসপত্র ব্যবহারে বৈচিত্র্য এসেছে। তাই একদিকে মৃিশল্পের অবনতি হলেও অন্যদিকে এ শিল্পের প্রসার ঘটছে নতুন আঙ্গিকে। যেহেতু এটা কাদামাটির কাজ, অত্যন্ত পরিশ্রমের কাজ, মর্যাদা কম এবং আয় একেবারেই সীমিত তাই এ শিল্পের কারিগররা দিন দিন অন্য পেশায় ঝুঁকে পড়ছে। বেশির ভাগ ঝুঁকে পড়েছে স্বর্ণালঙ্কার শিল্পের দিকে। তবে যারা গৃহস্থালি সামগ্রী ছেড়ে টেরাকোটা, ট্যালি, টব, গহনা, শো-পিস ইত্যাদি বানাচ্ছে তারা কিছুটা ভালো আছে এবং তাদের ভবিষ্যত্ কিছুটা সম্ভাবনাময়ী।’

শান্তি অশান্তির কিছু নেই। লেখাপড়ার সুযোগ ছিল না। কুমাররা বরাবরই অভাবী। কাজেই বাধ্য হয়েই তখন একটি পাল পরিবারের ছেলে, মেয়ে, ছোট, বড় প্রত্যেকটি সদস্যকে মাটির কাজ শিখতে হতো এবং করতে হতো।

কিন্তু ভালো পরিবেশে ভালো কাজ রেখে কার মনে চায় এ কাদা মাটির কাজ করতে? ছেলে মেয়েরা শিক্ষিত হচ্ছে। মর্যাদাসম্পন্ন পেশা পাচ্ছে। সুন্দরভাবে পরিচ্ছন্ন ও সচ্ছল জীবন যাপন করতে পারছে। এখন আর কেউ গায়ে কাদা মাটি লাগাতে চায় না। তাই মৃিশল্প ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


সংস্কৃতি ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন