আলোচনার সুযোগ এখনো রয়েছে : উত্তর কোরিয়া

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে প্রস্ত্মাবিত বৈঠক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাতিল ঘোষণার পর পিয়ংইয়ং জানিয়েছে, আলোচনার সুযোগ এখনো রয়েছে। শুক্রবার উত্তর কোরিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিম কাই গোয়ান এ তথ্য জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার কিমের কাছে লেখা এক চিঠিতে ট্রাম্প বৈঠকটি বাতিলের সিদ্ধান্ত্মের কথা জানান। কারণ হিসেবে তিনি উত্তর কোরীয় নেতার সাম্প্রতিক বিবৃতিতে 'তীব্র ক্ষোভ ও প্রকাশ্য শত্রম্নতা' থাকার কথা উলেস্নখ করেছেন। সংবাদসূত্র : বিবিসি, রয়টার্স, আল-জাজিরা আগামী ১২ জুন সিঙ্গাপুরে কিম জং-উনের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকে বসার দিনক্ষণ নির্ধারিত ছিল। তবে সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ার বিষয়ে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন 'লিবিয়া মডেল' অনুসরণের কথা বলেন। এর পরপরই ট্রাম্প-কিম প্রস্ত্মাবিত বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা শুরম্ন হয় এবং দুই পক্ষের মধ্যে হুমকি, পাল্টাহুমকি দেয়া শুরম্ন হয়।

বৃহস্পতিবার উত্তর কোরিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছিলেন, 'হয় যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সঙ্গে বৈঠক কক্ষে বসবে, অথবা পারমাণু অস্ত্র বনাম পরমাণু অস্ত্র দিয়ে মোকাবেলা হবে, যা পুরোটাই তাদের সিদ্ধান্ত্ম ও ভালো ব্যবহারের ওপর নির্ভর করছে।' এরপরই কিম জং-উনের কাছে লেখা এক চিঠিতে ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি সম্মেলন বাতিল ঘোষণা করছেন। চিঠিতে ট্রাম্প বলেন, 'আপনার সঙ্গে মিলিত হতে আমি খুব উদগ্রীব ছিলাম। তবে দুঃখজনক, আপনার সাম্প্রতিক বিবৃতিতে তীব্র ক্ষোভ ও প্রকাশ্য শত্রম্নতা প্রকাশিত হওয়ায় আমি মনে করছি, এই সময়ে দীর্ঘ পরিকল্পিত এই বৈঠক সঠিক হবে না।' তিনি ওই চিঠিতে আরও লিখেছেন, 'আপনি আপনার পারমাণবিক সক্ষমতার কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের কাছে এর চেয়েও ভয়াবহ ও শক্তিশালী অস্ত্র রয়েছে। কিন্তু আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, যেন এগুলো কখনো ব্যবহৃত না হয়।'

ট্রাম্পের এই চিঠির প্রতিক্রিয়ায় আগের অবস্থান থেকে কিছুটা নমনীয় অবস্থানে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। শুক্রবার বলা হয়েছে, পরমাণু কর্মসূচির বৈঠক নিয়ে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, তথাকথিত 'ট্রাম্প ফর্মুলা' তার অবসান ঘটাবে বলে পিয়ংইয়ং আশা করছে।

উত্তর কোরিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিম কাই গোয়ান বলেন, 'আমরা এরপরও আন্ত্মরিকভাবে আশা করছি, সেই 'ট্রাম্প ফর্মুলা' উভয়পক্ষের ভীতিকে দূর করবে এবং আমাদের পক্ষ থেকে দেয়া দাবিকে সমন্বয় করবে এবং বিষয়টি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।' উত্তরের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কিন প্রেসিডেন্টের এ ঘোষণাকে 'অত্যন্ত্ম দুঃখজনক' হিসেবে অভিহিত করে বলেন, উত্তেজনা নিরসন ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে বিদ্যমান দূরত্ব কমাতে যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসনের সঙ্গে 'যে কোনো সময়' কথা বলতে পিয়ংইয়ং প্রস্তুত। তিনি বলেন, 'শীর্ষ বৈঠক বাতিলে তার হঠাৎ ও একতরফা এ সিদ্ধান্ত্ম আমাদের জন্য অনেকটাই অপ্রত্যাশিত, আমরা অত্যন্ত্ম দুঃখিত।'

কয়েক দশক ধরে মুখোমুখি অবস্থানে থাকা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইনের সঙ্গে উত্তরের শীর্ষ নেতা কিম জং-উনের বৈঠকের পর কোরীয় উপদ্বীপে শান্ত্মি ফেরার আশা করা হচ্ছিল। বৈরিতার অবসান ঘটিয়ে কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করতে একসঙ্গে কাজ করারও ঘোষণা দিয়েছিলেন দুই নেতা। ওই ঈবঠকের ধারাবাহিকতায় কিম ও ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠকে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করছিলেন পর্যবেক্ষকরা। পিয়ংইয়ং অবশ্য একতরফা কেবল নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র বিসর্জন দেয়া হবে না বলে জোর দিয়ে আসছিল।

চলতি মাসের শুরম্নতে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেওর উত্তর কোরিয়া সফরের পরপরই কিমের সঙ্গে বৈঠকের তারিখ ও স্থান নির্ধারিত হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ১২ জুনে সিঙ্গাপুরে প্রস্ত্মাবিত ওই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে, তা হতো দায়িতপ্রাপ্ত কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে উত্তরের কোনো শীর্ষ নেতার প্রথম মুখোমুখি বৈঠক। কিন্তু চলতি মাসের মাঝামাঝি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া নিয়ে পিয়ংইয়ংয়ের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের ক্ষেত্রে 'লিবিয়া মডেল' অনুসরণ করা হতে পারে- এমনটা বললে বৈঠক নিয়ে অনিশ্চয়তা শুরম্ন হয়। উলেস্নখ্য, ২০০৩ সালে লিবিয়া পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি ত্যাগ করার অল্প কয়েক মাসের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র লিবিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কও পুনঃস্থাপিত হয়। এর আট বছর পর ন্যাটো সমর্থিত বিদ্রোহী ও আধাসামরিক গোষ্ঠীর হাতে ক্ষমতাচু্যত হন গাদ্দাফি এবং নিষ্ঠুরভাবে নিহত হন। বোল্টনের দেয়া লিবিয়া মডেলের উদাহরণ উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং-উনকে আতঙ্কিত করতে পারে তখনই ধারণা করেছিলেন পর্যবেক্ষকরা। পিয়ংইয়ং বোল্টনের মন্ত্মব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানালে পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানান, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেত্রে 'লিবিয়া মডেল' অনুসরণের কথা ভাবছেন না তারা। তবে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস-প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স একই প্রসঙ্গের অবতারণা করে বলেন, 'উত্তর কোরিয়ার সম্ভবত লিবিয়ার মতোই পরিণতি ঘটবে।' যার প্রতিক্রিয়ায় উত্তরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক উপমন্ত্রী চোয়ি সন-হুই মার্কিন ভাইস-প্রসিডেন্ট পেন্সের মন্ত্মব্যকে 'কা-জ্ঞানহীন' আখ্যা দেন। কূটনীতি ব্যর্থ হলে পারমাণবিক অস্ত্র প্রদর্শনী শুরম্ন হয়ে যেতে পারে বলেও সতর্ক করেন তিনি। এর পরপরই বৃহস্পতিবার কিমকে লেখা চিঠিতে বৈঠক বাতিলের কথা জানান ট্রাম্প।

বৈঠক বাতিলের সিদ্ধান্ত্মে হতভম্ব মুন উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং-উনের সঙ্গে পূর্ব নির্ধারিত বৈঠক বাতিলে ট্রাম্পের সিদ্ধান্ত্মে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন। সিউল প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে জানানো হয়, বৃহস্পতিবার এক জরম্নরি বৈঠকে মুন জায়ে-ইন তার শীর্ষ কর্মকর্তাদের বলেন, ট্রাম্প-কিমের বৈঠক বাতিলের খবরে তিনি অত্যন্ত্ম হতভম্ব এবং এটিকে তিনি দুঃখজনক বলেও মন্ত্মব্য করেন। ট্রাম্প ও কিমের মধ্যে আরও 'সরাসরি ও ঘনিষ্ঠ' আলোচনার আহ্বান জানিয়ে মুন বলেন, বৈঠক বাতিল ঘোষণার মাধ্যমে কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত করার বিষয়টি দীর্ঘায়িত করা উচিত হবে না। এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়া উভয় পক্ষকেই শান্ত্মিপ্রক্রিয়া থেকে পিছিয়ে না আসতে অনুরোধ জানিয়েছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্ত্মনিও গুতেরেস। তবে রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর টম কটন ট্রাম্পের প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে, ডেমোক্রেট সিনেটর ব্রায়ান স্কাটজ বলছেন, ট্রাম্পের মতো 'শিক্ষানবীশ যখন যুদ্ধবাজদের সঙ্গে জোড়া বাঁধে' তখন এমনটা ঘটাই স্বাভাবিক।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


আন্তর্জাতিক ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন