দুই প্রধানমন্ত্রী তিস্তা নিয়ে আলোচনা

তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি কি আলোর মুখ দেখবে? এ নিয়ে বহুদিন ধরেই অধীর অপেক্ষায় বাংলাদেশ। সরকারের পক্ষ থেকে তৎপরতারও কোনো কমতি নেই। তারপরও এ চুক্তি আটকে আছে অপ্রত্যাশিত কিছু জটিলতায়। কিন্তু এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে অবশেষে তিস্তায় বরফ গলতে শুরু করেছে বলে জানা গেছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী একাধিক সূত্রের মতে, গত শনিবার সন্ধ্যায় কলকাতার তাজবেঙ্গল হোটেলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তিস্তা চুক্তি নিয়ে আগের চেয়ে নমনীয় সুরেই কথা বলেছেন। যদিও বৈঠক থেকে বের হয়ে সাংবাদিকদের সামনে তার বক্তব্য ছিল, 'দুই প্রধানমন্ত্রী তিস্তা নিয়ে কথা বলেছেন। তাই এ নিয়ে কোনো কথা বলতে চাই না।'

এবার সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পৃথক বৈঠক হয়েছে। ফলে এ দুটি বৈঠকের আলোচনা সম্পর্কে কার্যত কোনো কিছুই প্রকাশ পায়নি। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একান্ত আলোচনার পর সাংবাদিকদের সামনে মমতার ওই বক্তব্য নিয়েই শুরু হয়েছে জল্পনা-কল্পনা। সত্যিই কি তাহলে এবার তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে বরফ গলতে শুরু করেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এবারের ভারত সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জানিয়ে ঢাকার কূটনৈতিক বিশ্নেষকরা বলছেন, দুই বন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক এখন অনেক উচ্চতায়। এ অবস্থায় তিস্তাসহ অন্যান্য অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ঝুলে থাকা সমস্যার দ্রুত সমাধান হবে- এটাই প্রত্যাশিত।

এবারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের কার্যক্রম আলাদা হলেও এ পরিস্থিতিতে বরাবরের মতো তিস্তা চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। কারণ, তিস্তার পানি চুক্তি বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের কাছে এখন শুধু চাহিদা নয়, আবেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী নির্বাচনে এ পানি চুক্তি বাংলাদেশ ও ভারতের নির্বাচনী রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলেই বিবেচনা করা হচ্ছে। তিস্তার পানি চুক্তি হলে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের পক্ষে বিরোধীপক্ষের সব অভিযোগের জবাব এক নিমেষেই হয়ে যাবে। একইভাবে তিস্তা চুক্তি হলে নরেন্দ্র মোদির বিজেপির জন্যও প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে একটা ভালো পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যাবে। তবে এ নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক চাওয়া-পাওয়া ভিন্ন হওয়ার কথা। বিশ্নেষকদের মতে, তিনি একদিকে যেমন নির্বাচনের আগে বিজেপিকে কোনো কৃতিত্ব দিতে চাইবেন না, অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় 'সেন্টিমেন্টও' নিজের দিকেই রাখার চেষ্টা করবেন। আবার বাংলাদেশ প্রশ্নেও তার পক্ষে নেতিবাচক অবস্থান নেওয়াটা সহজ নয়। এ অবস্থায় তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়নে মমতার ভূমিকাই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

এর আগে দেখা গেছে, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তীব্র আপত্তিতে ২০১১ সাল থেকে বারবার ধাক্কা খেয়েছে তিস্তা চুক্তি। ওই বছর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরেই তিস্তা চুক্তি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে তা হয়নি। সেই থেকেই ঝুলে আছে বিষয়টি। মমতা তিস্তা চুক্তি নিয়ে বারবার টেনে আনছেন সিকিমের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পকে।

এবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরের প্রাক্কালে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থানের ব্যাপারে তার ঘনিষ্ঠ মহল জানিয়েছিল, মমতার সামনে বৈঠক হলে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনায় তিস্তা চুক্তির প্রসঙ্গ উঠবে কি-না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। পরে অবশ্য দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে একান্ত। মমতার সঙ্গেও একান্তে আলাপ হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার।

শান্তিনিকেতনে নবনির্মিত বাংলাদেশ ভবনে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রায় এক ঘণ্টার বৈঠকে তিস্তার পানিবণ্টন ইস্যুটি আলোচিত হয়েছে- এ ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছিল। এরপর আসানসোলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে একমঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী মমতা থাকবেন এবং সেখানে তিস্তা প্রসঙ্গ উঠবে- এমন ধারণা করা হলেও অজুহাতে অনুষ্ঠানটি এড়িয়ে যান মমতা। যদিও বিকেলে কলকাতার তাজবেঙ্গল হোটেলে প্রায় ৪০ মিনিট কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে 'দুই প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে কথা বলেছেন'- সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিস্তার প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান মমতা। অবশ্য তিনি বৈঠক ফলপ্রসূ বলে মত দেন।

এ নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের কূটনৈতিক সূত্র জানায়, বৈঠকে তিস্তা প্রসঙ্গ উঠলে এবার চুক্তির ব্যাপারে অনেকটাই নমনীয় ছিলেন মমতা। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী সূত্রের খবরও- হাসিনা-মমতা বৈঠকে তিস্তা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনাই হয়েছে। সূত্র জানায়, এ বৈঠকে উঠেছিল তিস্তা নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির প্রসঙ্গও। যেখানে ৩ থেকে ১৫ বছরের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।

তবে এ ব্যাপারে দুই দেশের কারও পক্ষ থেকেই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি। তারপরও এ বৈঠকের পর চুক্তি নিয়ে আশার আলো দেখতে শুরু করেছেন অনেকে। বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ওয়ালিউর রহমান সমকালকে বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন অনন্য উচ্চতায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদি যেভাবে অভ্যর্থনা জানিয়েছেন, সম্মান দিয়েছেন, তাতেই বোঝা যায়, এ দুই নেতা বন্ধু রাষ্ট্রের মধ্যে ঝুলে থাকা সমস্যা দূর করতে খুবই আন্তরিক। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীও আন্তরিকভাবে এ চুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর ভূমিকা রাখবেন- এটাই প্রত্যাশা। কূটনৈতিক বিশ্নেষক হুমায়ুন কবীর বলেন, বাংলাদেশের মানুষ অধীর আগ্রহে তিস্তা চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। এ চুক্তি ঝুলে থাকার কারণে অভিন্ন আরও নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমঝোতার বিষয়টিও ঝুলে থাকছে।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


বাংলাদেশ ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন