আর্জেন্টিনার জয়

চার মিনিট; অতিরিক্ত সময়ের আরো মিনিট চারেক না হয় যোগ করুন। আট মিনিট। বিশ্বকাপের বিশ্বমঞ্চ থেকে বিদায়ের সঙ্গে ওইটুকুন দূরত্বেই ছিল আর্জেন্টিনা। মহাকালের মহানায়ক লিওনেল মেসির কান্নাভেজা বিদায়েরও। কিন্তু ফুটবলকে যে দেশ এত কিছু দিয়েছে, যে ফুটবলার রঙিন করে দিয়েছেন আধুনিক ফুটবল—তাঁদের প্রতি এত নিষ্ঠুর হন কিভাবে ফুটবল বিধাতা!

তাই তো মার্কোস রোহোর ৮৬ মিনিটের গোলে নাইজেরিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে দেয় আর্জেন্টিনা। উঠে যায় রাশিয়া বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে। তিন খেলায় চার পয়েন্ট নিয়ে ‘ডি’ গ্রুপের রানার্স আপ মেসির দল। দ্বিতীয় রাউন্ডে ‘সি’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের বিপক্ষে খেলবে তারা। গ্রুপের আরেক খেলায় আইসল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে ৯ পয়েন্ট নিয়ে ‘ডি’ গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন ক্রোয়েশিয়া।

আগের দিন কোচ হোর্হে সাম্পাওলি বারবার বলছিলেন, আর্জেন্টাইন ফুটবল ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ হবে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে। সে অধ্যায়ের নায়ক যে হবেন ডিফেন্ডার রোহো, তা কে জানতেন! ম্যাচ যখন ১-১ গোলের সমতায়, আর্জেন্টিনা যখন বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যাওয়ার দোরগোড়ায়—তখনই সময়ের প্রয়োজনে জন্ম হয় এই নতুন বীরের। ডান দিক থেকে গাব্রিয়েল মেরকাদোর ক্রসে ডান পায়ের দারুণ শটে গোল করে সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামকে উল্লাসে ভাসিয়ে দেন রোহো।

একাদশে পাঁচ পরিবর্তন নিয়ে খেলতে নামে আর্জেন্টিনা। গোলরক্ষক ফ্রাঙ্কো আরমানি ছাড়াও প্রথম এগারোতে ঢোকেন মার্কোস রোহো, এভার বানেগা, আনহেল দি মারিয়া ও গনসালো হিগুয়েইন। তাতে তাঁদের খেলার ধার বেড়েছে অনেক। আর দলের খেলা যদি ভালো হয়, গোল করার জন্য ১০ নম্বর জার্সিপরা ওই জাদুকর তো রয়েছেনই। মেসির বিশ্বকাপ শুরুর ঘোষণা ছিল প্রথমার্ধে। আর তা প্রবলভাবেই। চোখজুড়ানো গোল দিয়েছেন ম্যাচের ১৪তম মিনিটেই। মাঝমাঠের বাঁ দিক থেকে এভার বানেগা বল ভাসিয়ে দেন নাইজেরিয়ার রক্ষণভাগের ওপর দিয়ে। পেছনে থাকা মেসি দৌড় শুরু করেন ঠিক সময়ে। বানেগার দুর্দান্ত পাসে প্রতিপক্ষের রক্ষণে চিড় ধরে বটে, তবে তখনো অনেক কিছুই করা বাকি। ছোট্ট লাফে বাঁ উরুতে বল নিয়ে জাদুকরী বাঁ পায়ের আরেক স্পর্শ। খুলে যায় গোলমুখ। শরীরের ভারসাম্য বদলে ডান পায়ের কোনাকুনি শটে বল পাঠিয়ে দেন জালে। এরপর দুই হাত ছড়িয়ে মেসির যে উদ্যাপন, সেটিতে শুধু গোলের আনন্দ না, আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ স্বপ্ন টিকিয়ে রাখারও স্বস্তি।

শুধু গোলেই না, পুরোটা সময়ই ব্যতিব্যস্ত রাখেন নাইজেরিয়ার রক্ষণভাগকে। ২৭তম মিনিটে বাঁ পায়ের টোকায় মেসির নিখুঁত পাসের জবাব নাইজেরিয়ার রক্ষণভাগের কাছে ছিল না। সের্হিয়ো আগুয়েরোর বদলে একাদশে ঢোকা গনসালো হিগুয়েইন দৌড়ে বলটি পেয়েও যান। এরপর চেষ্টা করেন নাইজেরিয়ার গোলরক্ষকের ওপর দিয়ে বলটি তুলে দিতে। কিন্তু বলের অতটা নিচের দিকে বুট লাগাতে পারেননি। গোলরক্ষকের গায়ে লেগে ফিরে আসে বল। সুযোগটা খানিক কঠিন ছিল সত্য, কিন্তু গোলরক্ষককে একা পেয়েও যে হিগুয়েইন গোল করতে পারেননি—তাও মিথ্যা না।

৩৩তম মিনিট হতে পারত ম্যাচের ফল নির্ধারণী। প্রথমত আনহেল দি মারিয়াকে ফাউল করার অপরাধে লিয়ন বালোগানকে যদি লাল কার্ড দেখাতেন রেফারি। কিন্তু হলুদ কার্ডেই পার পেয়েছেন ওই ডিফেন্ডার। এর পরও তো ওই ফ্রি-কিকে গোল হতে পারত। পেনাল্টি এরিয়ার ঠিক বাইরে বাঁ দিকে ফ্রি-কিক পায় আর্জেন্টিনা। দেয়ালের ওপর দিয়ে ভাসিয়ে বাঁ পায়ের শটে মেসির তো সুপার ঈগলস গোলরক্ষকের ডান দিকেই মারার কথা। প্রায় সবাই তাই ভাবলেন, আর্জেন্টাইন অধিনায়ক করলেন উল্টো। তাতে কাজ হয়ে গিয়েছিল প্রায়। ফ্রান্সিস উজোহো কোনো মতে গ্লাভসে বল ছোঁয়াতে পারেন। তাতেই জালে না গিয়ে পোস্টে প্রতিহত হয় তা।

তবু স্বস্তি নিয়ে বিরতিতে যায় আর্জেন্টিনা। সেটি অস্বস্তিতে রূপান্তরিত হতে সময় লাগেনি। দ্বিতীয়ার্ধের চতুর্থ মিনিটেই পেনাল্টি পেয়ে যায় নাইজেরিয়া। আর তা হাভিয়ের মাসচেরানোর নির্বুদ্ধিতায়। প্রথমার্ধে কয়েকটি ভুল পাসে আর্জেন্টিনার সর্বনাশ ডেকে আনছিলেন প্রায়। এবার আর রক্ষা হলো না। কর্নারের সময় বক্সের ভেতরে বালোগানকে টেনে ফেলে দেওয়ার অপরাধে পেনাল্টির বাঁশি বাজান রেফারি। ভিএআরেও সিদ্ধান্ত পাল্টানোর মতো কিছু খুঁজে পাননি রেফারি। দর্শকদের শিষে সেন্ট পিটার্সবার্গ স্টেডিয়ামে তখন কানে তালা লেগে যাওয়ার জোগাড়। এর মধ্যেই ঠাণ্ডা মাথায় পেনাল্টি থেকে গোল করেন ভিক্তর মোসেস। প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক না হলেও ১৯৯০ আসরে সের্হিয়ো গয়কোচিয়া যেমন পেনাল্টির পর পেনাল্টি ঠেকিয়ে আর্জেন্টিনার ত্রাতা হয়ে উঠেছিলেন, সেটি পারলেন না ফ্রাঙ্কো আরমানি। তাঁর বাঁয়ে গড়ানো শটে গোল করেন মোসেস।

গোল খেয়ে হতভম্ব হয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। মিনিট কয়েক পর দি মারিয়াকে ফাউল করলে পেনাল্টি না দেওয়াতেও। আর্জেন্টিনার তখন গোল বড্ড প্রয়োজন। কিন্তু অতি আক্রমণাত্মক হতে গিয়ে বেশ কয়েকবার গোল খাওয়ার হাত থেকে বেঁচে যায় ভাগ্যগুণে। ৭১ মিনিটেই যেমন বাঁ দিক থেকে আহমেদ মুসার পাসে ওডিওন ইগহালোর ডামিতে বল চলে যায় ওগেহেনাকারো ইটেবোর কাছে। কিন্তু শট পোস্টে রাখতে পারেননি। আর ৭৫তম মিনিটে ওডিওন ইগহালোর মিসের কারণে তাঁকে আর্জেন্টিনার নাগরিকত্ব দিয়ে দেওয়া যায়। গোলরক্ষকের সামনে বল পেয়েও মেরে দেন বাইরে। ওই বিল্ড আপে বল রোহোর হাতে লাগলে ভিএআরের সাহায্য নেয় রেফারি। তাতে আরেকটি পেনাল্টি দিতেই পারতেন। তাহলেই খলনায়ক রোহো; ট্র্যাজেডির নায়ক মেসি। ভাগ্যিস, পেনাল্টিটি হয়নি। ঠিক যেমন ৮৩ মিনিটে আরমানিকে একা পেয়েও গোল করতে পারেননি ইগহালো।

ঠিক তখনই অপ্রত্যাশিত নায়ক রোহোর আবির্ভাব। মেসি যখন পরিষ্কার সুযোগ পান না, হিগুয়েইন পারেন না আগের তিন ফাইনালের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে—তখনই রোহোতে রক্ষা আর্জেন্টিনার। মেসির বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নও তাই টিকে রইল।

মহাকালের এই মহানায়ককে এভাবে প্রথম রাউন্ডে কিভাবে শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেয় বিশ্বকাপ!




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


খেলা ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন