সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন অওয়ামী লীগ।

দরোজায় কড়া নাড়ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচনে সকল দলে অংশ নেয়া এখনও অনেকটা অনিশ্চিত রয়ে গেলেও সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে ক্ষমতাসীন অওয়ামী লীগ। নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কাজও প্রায় চুড়ান্ত।নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারে থাকছে না বিএনপি বা সংসদের বাইরের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বল্প সদস্যের নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের প্রতিনিধিসহ রাখা হচ্ছে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির একাধিক সদস্যকে।
চলতি মাসের ১৭ বা ১৮ তারিখ সামনে রেখে বঙ্গভবনে নির্বাচনকালীন সরকারের শপথ অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে।
প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করানোর আহ্বান জানাবেন। ওইদিন্ই শপথের শিডিউল চুড়ান্ত জানা যাবে।
বঙ্গভবন সূত্র জানিয়েছে,পূর্ব নির্ধারিত রাষ্ট্রপতির কার্যসূচিতে ১৬ থেকে ২০ অক্টোবর ফাঁকা রাখা হয়েছে। নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও শপথ আয়োজনের জন্য এসময় রাষ্ট্রপতির কেনো কর্মসূচি রাখা হয়নি।
সূত্র জানায়, আগামী ১৪ ও ১৫ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কাছে নেদারল্যান্ডস ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ কয়েকটি দেশের রাষ্ট্রদূত কাছে পরিচয়পত্র পেশ করবেন। ২১ অক্টোবর তিনি ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট ফোরামের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে সুইজারল্যান্ডের জেনেভাতে যাবেন প্রেসিডেন্ট।ফিরবেন ২৬ অক্টোবর। মাঝখানে ফাঁকা রাখা সময়েই নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে । অন্তর্বর্তী সরকারের শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্ততি নেওয়া হচ্ছে উল্লেথিত সময়কে সামনে রেখে। এর আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের একাধিকবার সাংবাদিকদের কাছে অক্টোবরের মাঝামাঝি সময়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠনের কথা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বর্তমান মন্ত্রিসভায় বর্তমানে ৩৩ মন্ত্রী, ১৭ প্রতিমন্ত্রী, দুজন উপমন্ত্রী ও মন্ত্রীর পদমর্যাদায় পাঁচজন উপদেষ্টা রয়েছেন। নির্বাচনী সরকারে গঠিত হবে ২০ থেকে ২৫ জনকে নিয়ে ।এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে বর্তমান মন্ত্রিসভায় থাকা অর্ধেকের বেশি মন্ত্রীর জায়গা হচ্ছে না নির্বাচনকালীন সরকারে।
সরকারের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জাানায়, অপেক্ষাকৃত ক্লিন ইমেজের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরেই নির্বাচনকালীন সরকারে রাখছেন প্রধানমন্ত্রী। আওয়ামী লীগ ছাড়াও জাতীয় পার্টি থেকে তিনজন এবং ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাসদ থেকে একজন করে মন্ত্রী রাখা হচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকারে। কোনোভাবেই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এই মন্ত্রিসভার সদস্য ২৫ এর হচ্ছে না।
এর আগে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০১৩ সালের ২১ নভেম্বর গঠিত নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভার সদস্য ছিল ৯ সদস্যের। রাখা হয়েছিল ১০ জন উপদেষ্টা। সব মিলিয়ে সরকারে ছিলেন ৩৯ জন। ওই সময় মন্ত্রিসভার সব সদস্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পুরনো কয়েকজনকে রেখে এবং নতুন যোগ করে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। এবারও একই পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছাড়া অন্য কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় নিজেদেরয় থাকা না থাকার বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি। অনেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী তাই নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে খোঁজখবর রাখছেন। তবে অন্তবর্তী সরকার গঠনের সবকিছুই নির্ভর করছে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তোর ওপর।
সরকারের উচ্চ পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আওয়ামী লীগকে টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আনার লক্ষ্য সামনে রেখে একমাস আগে থেকেই হোমওয়ার্ক শুরু করেছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার কৌশল, ইশতেহার তৈরিসহ নির্বাচনকালীন সরকার গঠন- সবই প্রধানমন্ত্রীর পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ীই হবে।
একাধিক সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের আওয়ামী লীগ দলীয় সদস্যদের মধ্য থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নির্বাচনকালীন সরকারের মন্ত্রিসভায় থাকতে পারেন এমন তালিকায় রয়েছেন- অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, রেলমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক, বিমানমন্ত্রী একেএম শাহজাহান কামাল, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন সিকদার, ভূমি প্রতিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেক, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং কারিগরী ও মাদরাসা শিক্ষা বিভাগের প্রতিমন্ত্রী কাজী কেরামত আলী।
পাশাপাশি জাতীয় পার্টি থেেকে নির্বাচনকালীন মন্ত্রিসভায় তিনজন প্রতিনিধি রাখা হচ্ছে। জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ দলের নতুন তিন মুখকে অন্তবর্তী সরকারে দেখতে চান। গতমাসে সংসদ অধিবেশন চলাকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে অনির্ধারিত এক বৈঠকে তিনি নিজের এ ইচ্ছের কথা জানান। তবে সংসদের বিরোধীদলীয় নেত্রী রওশন এরশাদ দলীয় ফোরামে তিনি নিজে নির্বাচনকালীন সরকারে থাকতে চান বলে জানিয়েছেন।
এছাড়া জাসদের একাংশের সভাপতি তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু এবং ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের নির্বাচনী মন্ত্রিসভায় থাকাটা অনেকটাই নিশ্চিত। এলডিপি সভাপতি কর্নেল অবসরপ্রাপ্ত অলি আহমেদ ও কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী নিয়েও গুঞ্জন আছে যে, শেখ হাসিনা চমক হিসেবে এ দুজনকে মন্ত্রিসভায় আনতে পারেন। যদিও কোনো পক্ষই এর সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।যুক্তফ্রন্টে ও জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার ব্যানারে অলি আহমেদ ও কাদের সিদ্দিকী যোগ না দেওয়া এ গুঞ্জন আরও পোক্ত হয়েছে।
এদিকে নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা হয়নি। এ নিয়ে দেশের প্রধান দুই দল দুই মেরুতে অবস্থান করছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বলছে, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হবে। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে মাঠের বিরোধী দল বিএনপি বলছে, বর্তমান মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ভোট দিতে হবে। একই দাবি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া এবং বি চৌধুরীরর নেতৃত্বাধীন ঐক্য প্রক্রিয়ারও। সম্মিলিতভবে তারা দেশজুড়ে আন্দোলন গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন।
সংবিধান অনুযায়ী, নির্বাচনের সময় আগের নির্বাচিত সরকারই তার দায়িত্ব পালন অব্যাহত রাখবে। নির্বাচন পরিচালনা করবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনের সময় সরকারের আকার ছোট করা বা কেবল নির্বাচিত প্রতিনিধি নিয়ে সরকার গঠনের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। সরকারের কর্তব্য হলো রুটিন দায়িত্ব পালন করা এবং সুষ্ঠ নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনকে সর্বাত্মক সহায়তা করা। তবে সরকারের আকার ছোট বা বড় করার এখতিয়ার প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে। এটা তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা। তিনি যে কোনো সময় তা করতে পারেন।
সংবিধানের ৫৭(৩) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধানমন্ত্রীর উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকিতে এই অনুচ্ছেদের কোনো কিছুই অযোগ্য করিবে না।’ এর অর্থ হচ্ছে যিনি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি নতুন একজন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত সপদে বহাল থাকবেন। এখানে নির্বাচনী সরকার গঠনেরই কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।
সংবিধান অনুসারে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সপদে বহাল রেখেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করার প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন ।
নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী সরকারে সংসদের বাইরের দল বিএনপির থাকার সম্ভাবনা নেই-আগেই স্পষ্ট করেছে সরকার। তবে কূটনৈতিক মহল এবং সুশীল নাগরিক সমাজের একটি অংশ সব দলের অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে বিএনপিকে অন্তবর্তী সরকারে যুক্ত করতে পরামর্শ দিচ্ছেন। তবে সরকার আগের অবস্থানেই অনড় রয়েছে। সরকারী দলের নীতি নির্ধারকরা মনে করছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিএনপিসহ সবদলই শেষপর্যন্ত অংশ নিবে।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


রাজনীতি ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন