ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার রায়

১৪টা বছর জাতির ইতিহাস এক ভয়াবহ কলঙ্কের ভার বহন করে চলেছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বুকে যা ঘটেছিল, তা মনে করলেও শরীর শিউরে ওঠে, বিবেক হয়ে পড়ে যন্ত্রণাদগ্ধ। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং সে সময়ের প্রধান বিরোধী দলের নেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড ছোড়া হয়েছে জনসভায়। শেখ হাসিনাসহ অন্য কেন্দ্রীয় নেতৃবর্গকে একসঙ্গে খতম করে আওয়ামী লীগ তথা তৎকালীন বিরোধী দল তথা জাতিকে নেতৃত্বশূন্য করে দেওয়ার কী ভয়াবহ উদ্যোগ: নীলনকশা, ষড়যন্ত্র, গ্রেনেড জোগাড়, হামলা, অপরাধীদের পালিয়ে যেতে সাহায্য করা এবং অবশেষে ঘটনার দায় খোদ আওয়ামী লীগ আর ভারতের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা।

রক্তের স্রোত বয়ে গেল আরেক আগস্টে, এই বাংলায়। গ্রেনেড, বিস্ফোরণ, ধোঁয়া, স্প্লিন্টার, আর্তনাদ! নেতা-নেত্রীরা ঘিরে ধরলেন সভানেত্রীকে, রচনা করলেন মানববর্ম।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের সেই বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ওই গ্রেনেড হামলায় ঢলে পড়লেন আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান। মৃত্যুর আগে উড়ে গেছে তাঁর শরীর নিচের দিক; তিনি শূন্য চোখে এই পৃথিবীর দিকে অপলক তাকিয়ে আছেন, এই ফটো যতবার দেখি, ততবার মনে হয়, এ কি কোনো মানুষের কাজ! রাজনীতি এত নিষ্ঠুর, মানুষ এত নৃশংস হতে পারে! ওই হামলায় ২৪ জন নিহত হন। আহত হন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের কয়েক শ নেতা-কর্মী। তাঁদের অনেকে আজও শরীরে গ্রেনেডের স্প্লিন্টার নিয়ে দুঃসহ জীবন যাপন করছেন।

শরীরে স্প্লিন্টার নিয়ে আহত ব্যক্তিরা তাকিয়ে ছিলেন বিচারের দিকে। নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন, ১৪টা বছর। কিন্তু শুধু কি তাঁরাই? জাতির বিবেকেই যেন স্প্লিন্টারবিদ্ধ হয়ে ছিল। পুরা জাতিই চেয়েছে এই কলঙ্কের দায় থেকে মুক্তি।

আর কী সাংঘাতিক ব্যাপার! এই হামলা ও হত্যাকাণ্ডের জন্য উল্টো দায়ী করা হয়েছিল আওয়ামী লীগকেই। জজ মিয়া নাটকের সৃষ্টি করা হয়েছিল। জজ মিয়ার নাটকের পেছনের কাহিনি জাতির সামনে উন্মোচিত করে ।

তারপর আস্তে আস্তে আমরা জানতে পারি, এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং ব্যক্তি। তারা ষড়যন্ত্র করেছে, ঘটনার নীলনকশা প্রণয়ন করেছে, হামলাকারীদের নিযুক্ত করেছে, গ্রেনেড সরবরাহ করেছে, হামলাকারীদের নিরাপদে সরে পড়ার ব্যবস্থা করেছে, বিচারকে বিভ্রান্ত করেছে, প্রকৃত দোষী ব্যক্তিদের আড়াল করার চেষ্টা করেছে। নিজের ওপরে নিজেই বোমা মেরেছে আওয়ামী লীগ, এই বিভ্রান্তি ছড়ানোর অপপ্রয়াস পেয়েছে।

ধর্মের কল বাতাসে নড়ে। তবে এই বিচারপর্ব শুরু হয়েছে ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে। তার ওপরে কেটে গেছে ১১টা বছর। আজ ১০ অক্টোবর ২০১৮, মামলার রায় হলো। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২১ আগস্ট চালানো গ্রেনেড হামলা মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। এই মামলায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, সাবেক সাংসদ কায়কোবাদসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

শেখ হাসিনা এবং তাঁর সরকারকে ধন্যবাদ দিতে হবে, স্বয়ং শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য সংঘটিত হামলার বিচারও আদালতের মাধ্যমে হয়েছে। যেমন আইনানুগ বিচারের মাধ্যমে বছরের পর বছর বিচারকার্য পরিচালনা করে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায় হয়েছে, রায় কার্যকর করা হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও প্রকাশ্য আদালতে হয়েছে এবং হচ্ছে। কোনো শর্টকাট বিচারপদ্ধতি বেছে না নিয়ে সরকার যে আইনানুগ বিচারিক পদ্ধতিকেই বেছে নিয়েছে এবং কার্যকর করেছে, সে জন্য আমরা অবশ্যই সরকারের প্রশংসা করব। আইনানুগ বিচারের মধ্য দিয়েই জাতির আরেকটা কলঙ্কের মোচন হলো।

তবে দাগ মুছলেও পুরোটা কি আর মোছে? ওই দিন ওই ষড়যন্ত্রকারীরা শুধু যে ২৪ জনকে হত্যা করেছে, শত শত মানুষকে আহত করেছে, পঙ্গু করেছে, তা তো নয়, সভ্যতার ইতিহাসকে তারা কলঙ্কিত করেছে এবং বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সমঝোতার শেষতম সম্ভাবনাকেও চিরতরে হত্যা করেছে। সেই ক্ষতি আর পূরণ হওয়ার নয়।

আদালতে বিচার হয়েছে। আদালত শাস্তি দিয়েছে নানা মেয়াদের। এর প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত আইনানুগ। যদি কেউ রায়ে অসন্তুষ্ট হন, তিনি বা তাঁরা উচ্চ আদালতে আপিল করতে পারবেন। আইনি বিচারের রায়ের কেউ যদি প্রতিবিধান চান, সেটাও চাইতে হবে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই।

২১ আগস্টের আঘাতে আমাদের হৃদয় এখনো ক্ষতবিক্ষত। এই বিচারপ্রক্রিয়া এবং এই রায় ঐতিহাসিক, কারণ এটা জাতির ওপরে চেপে বসা ইতিহাসের দায় শোধ করার প্রক্রিয়ার একটা অংশ। ইতিহাসের কলঙ্ক মোচনের একটা প্রয়াস।

অশ্রু মুছে বেদনাহত চিত্তে আমরা এই রায়কে স্বাগত জানাই।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


বাংলাদেশ ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন