সংলাপে হতাশা বিএনপি

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ কাযর্ত ব্যথর্ হয়েছে বলে মনে করছে বিএনপি। কারণ ৭ দফার একটি দফাও মানেননি ক্ষমতাসীনরা। বিশেষ করে নিবার্চনকালীন সরকার, সংসদ ভেঙে নিবার্চন কিংবা খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে কোনো আশ্বাস মেলেনি

সংলাপে হতাশা, আন্দোলনেই সমাধান খুঁজছে বিএনপি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঐক্যফ্রন্টের সংলাপ কাযর্ত ব্যথর্ হয়েছে বলে মনে করছে বিএনপি। কারণ ৭ দফার একটি দফাও মানেননি ক্ষমতাসীনরা। বিশেষ করে নিবার্চনকালীন সরকার, সংসদ ভেঙে নিবার্চন কিংবা খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে কোনো আশ্বাস মেলেনি। এ জন্য আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের পথ খুঁজছে বিএনপি। আন্দোলনের সূচনা হিসেবে আগামী ৬ নভেম্বর ঢাকায় জনসভার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে আন্দোলনের দিকনিদের্শনা আসতে পারে। খেঁাজ নিয়ে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপের পরদিন শুক্রবার দিনব্যাপী বিএনপি নেতাকমীের্দর মধ্যে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল কী পেল বিএনপি? সংলাপের পর নেতাদের মধ্যে বৃহস্পতিবার রাতেই আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়ে কথা হয়। লন্ডনে দলের শীষর্ নেতা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও সংলাপের বিষয়বস্তু জানানো হয়।

এসব আলোচনায় নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপ কাযর্ত ব্যথর্ হয়েছে ধরে নিয়েই আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্দোলনের চ‚ড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে সংশ্লিষ্ট নেতাদের এরই মধ্যে নিদের্শনাও দেয়া হয়েছে। সংলাপ ব্যথর্ হওয়ার কারণ সংক্ষিপ্ত আকারে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাম প্রকাশ না করার শতের্ শুক্রবার বিএনপির সিনিয়র এক নেতা বলেন, ৭ দফার মধ্যে বিএনপির প্রধান দাবি হচ্ছে, নিবার্চনকালীন সরকার, সংসদ ভেঙে নিবার্চন ও খালেদা জিয়ার মুক্তি। এই তিনটি বিষয়ে সুরাহার কোনো লক্ষণও দেখা যায়নি সংলাপে। নিবার্চনকালীন সরকারের বিষয়ে সংবিধানসম্মতভাবেই ঐক্যফ্রন্টের শীষর্ নেতা ড. কামাল হোসেন বতর্মান সংকট নিরসনে একাধিক বিকল্প তুলে ধরেন। নিবার্চনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়ারও একটি রূপরেখা দেন। জবাবে সংবিধানের দোহই দিয়েই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নিবার্চনের ব্যবস্থা করা কোনোভাবে সম্ভব নয় বলে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে জানানো হয়। ১/১১ প্রসঙ্গ টেনে এ দেশে নিরপেক্ষ কে, তা জানতে চেয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দেয়া হয় ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে।

এ সময় বিএনপি নেতারা ১৯৯৬ সালে তত্ত¡াবধায়ক সরকারের কথাও বলেন। জবাবে ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বলা হয়, সেসময়ের প্রেক্ষাপট ভিন্ন ছিল। এখন ওই ধরনের কোনো পরিস্থিতি নেই। যদি পরিস্থিতি থাকত তাহলে জনগণ আন্দোলন করত। এখনো প্রয়োজন হলে জনগণ আন্দোলন করবে। পারলে আন্দোলন করেই এ দাবি আদায় করে নেয়ার চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দেয়া হয় ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে। খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়টি বিএনপির নেতারা তুললে জবাবে শাসকদলের নেতারা জানান, এটি পুরোপুরি আদালতের বিষয়। তবে নেতাকমীের্দর বিরুদ্ধে করা গায়েবি রাজনৈতিক মামলার বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ক্ষমতাসীনরা। বিএনপির সিনিয়র এই নেতা বলেন, ঐক্যফ্রন্টের সাত দফার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কিছু বলেননি; শুধু তার ওপর আস্থা রাখার কথা বলেছেন। নিরপেক্ষ সরকার, সংসদ ভাঙা ও খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে কোনো সুরাহা না হলে প্রধানমন্ত্রীর ওপর কী জন্য আস্থা রাখতে হবে তা এখন বিএনপি নেতাকমীের্দর প্রশ্ন। সঙ্গত কারণে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায় করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এদিকে সংলাপের পর থেকে গতকাল দিনব্যাপী উচ্চ পযার্য় থেকে শুরু করে একবারে কমীর্রাও সংলাপের প্রকৃত বিষয়বস্তু জানতে আগ্রহী ছিলেন। ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি নেতাদের কার, কী ভ‚মিকা ছিল তাও নীতিনিধার্রণী পযাের্য়র নেতাদের কাছে জানতে চেয়েছেন অনেকে। তারা জানতে পেরেছেন, ৭টির একটি দাবিও মানেননি ক্ষমতাসীনরা। এরপরও কেন ঐক্যফ্রন্টের শীষর্ নেতা ড. কামাল হোসেনের সংলাপ ভালো হয়েছে বলে মন্তব্য করা এবং বিএনপির শীষর্ নেতা মিজার্ ফখরুল ইসলাম আলমগীর শুধু সংলাপে সন্তুষ্ট হতে পারেননি মন্তব্যের মধ্যে কেন সীমাবদ্ধ ছিলেন এ নিয়ে অনেকে ক্ষুব্ধ। নেতাকমীের্দর ক্ষোভ কমাতে সিনিয়র নেতারা জানিয়েছেন, তাৎক্ষণিকভাবে ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির শীষর্ নেতা যে মন্তব্য করেছেন তা কৌশলগত কারণে। সংঘাত নয়, সমঝোতার মাধ্যমে বিএনপি শেষ পযর্ন্ত চেষ্টা করেছে এবং করবে। তবে সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা না দেখে আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত হওয়ারও নিদের্শনা দিয়েছেন নেতারা। সূত্রমতে, বিএনপির পাশাপাশি ঐক্যফ্রন্টের অধিকাংশ নেতাও আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের পক্ষে। তবে ২/৩ জন নেতা আছেন তারা মনে করছেন সব দাবি আদায় সম্ভব না হলেও সুষ্ঠু নিবার্চনের পরিবেশ তৈরি এখনো আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব। এই আলোচনার জন্য আরও কিছু সময় নেয়া যায় কিনা তা নিয়ে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন তারা। জবাবে বিএনপি নেতারা বলেন, ঐক্যফ্রন্টের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীনরা যে আলোচনা করবেন সেই আলোচনায় কোনো লাভ হবে না। ক্ষমতাসীনরা নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসবেন না। আন্দোলনের মাধ্যমে এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে হবে, যাতে ক্ষমতাসীনরাই আলোচনার উদ্যোগ নেন।

সেই আলোচনা ফলপ্রসূ হবে। আন্দোলনের বিষয়ে ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শীষর্ নেতা নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীষর্ নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ৭ দফার কোনোটিই তো মানা হয়নি। বরং নেতিবাচক মন্তব্য করেছেন সরকারদলীয় লোকজন। দাবি আদায়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া হবে। সংলাপের না থাকলেও এর প্রাপ্তির বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, সংলাপের ফল শূন্যের কোঠায়। কোনো দাবি তারা মানবে না। বিএনপি সূত্রমতে, সংলাপ হলেও তা সফল হবে না ধরে নিয়েই দীঘির্দন ধরে আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি। এবার সংলাপ শেষ হওয়ায় চ‚ড়ান্ত আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে নেতাকমীের্দর এরই মধ্যে নিদের্শ দেয়া হয়েছে। তফসিল ঘোষণা করা হলে ওইদিন থেকে আন্দোলন শুরু করতে সব ধরনের প্রস্তুতি রাখতে দেশব্যাপী দলের সব ইউনিটের নেতাকমীের্দর আগেই বাতার্ দেয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপি নেতাকমীের্দর তফসিলের আগে গ্রেপ্তার এড়িয়ে সবোর্চ্চ সতকর্তার সঙ্গে তফসিলের দিনে মাঠের আন্দোলন সফল করার প্রস্তুতি রাখার নিদের্শনা দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, ঢাকার জনসভা থেকে আন্দোলনের চ‚ড়ান্ত নিদের্শনা আসবে। ৬ নভেম্বর ঢাকায় জনসভা আন্দোলনের সূচনা করার ঘোষণা দিতে এবং সংলাপের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গতকাল বিএনপির কেন্দ্রীয় কাযার্লয়ে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী । ঐক্যফ্রন্টের পক্ষ থেকে আগামী ৬ নভেম্বর সোহরাওয়াদীর্ উদ্যানে জনসভার কমর্সূচি ঘোষণা করে তিনি বলেন, এ জন্য প্রয়োজনীয় অফিসিয়াল কমর্কাÐ ইতিমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সোহরাওয়াদীর্ উদ্যানের কতৃর্পক্ষ ও পুলিশকে চিঠি দেয়া হয়েছে। আর গণপূতর্ কতৃর্পক্ষ জানিয়েছে, পুলিশের অনুমতি পেলে তাদের কোনো আপত্তি নেই। রিজভী জানান, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের জনসভা সফল করতে আজ বেলা ১১টায় নয়া পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কাযার্লয়ে বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের যৌথ সভা হবে।

স্থায়ী কমিটির বৈঠক

সংলাপ পর্যালোচনা ও পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে শুক্রবার রাতে গুলশাস্থ বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে বৈঠক করেছেন দলের নীতিনির্ধারণী ফোরামের নেতারা। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সভাপত্বিতে অনুষ্ঠিত স্থায়ী কমিটির সভায় আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া ফের সংলাপে অংশগ্রহণের বিষয়ে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে বলে জানানো হয়।

সূত্রমতে, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপ নিয়ে সব সদস্যই হাতাশা প্রকাশ করেন। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে সংলাপের আমন্ত্রণ না জানালে আর কোনো সংলাপে যোগ না দেয়ার পক্ষে অধিকাংশ সদস্য মত দেন। আগামী ৬ নভেম্বর ঢাকার জনসভা থেকে কঠোর আন্দোলনের পক্ষে অধিকাংশ সদস্য মত দিলেও কয়েকজন নেতা আগামী ৯ নভেম্বর রাজশাহীতে জনসভার পর থেকে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার পরামর্শ দেন।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


রাজনীতি ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন