উৎসব আমেজে আ.লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সম্ভাব্যপ্রার্থীদের মাঝে দলীয় মনোয়নপত্র বিক্রি শুরু করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। গতকাল শুক্রবার সকালে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মনোনয়ন ফরম বিক্রির মাধ্যমে এই কার্যক্রম শুরু হয়।

প্রথম দিনে একহাজার তিন’শ আটাশটি ফরম বিক্রি হয়েছে বলে জানিয়েছেন দলের দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২০৬, বরিশালে ১৫৪, সিলেটে ৭৮, ময়মনসিংহে ১৬১, রংপুর ১২৯, খুলনা ১৯৫, চট্টগ্রাম ২২১, রাজশাহীতে ১৮৪টি ফরম বিক্রি হয়। প্রতিটি ফরমের মূল্য ৩০ হাজার টাকা। আটটি বিভাগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ব্যক্তিদের কাছে আলাদা আটটি বুথ করে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি করা হয়। ধানমন্ডিতে দলটির বর্ধিত অফিসের দোতলা ও তৃতীয় তলা থেকে ফরম কিনছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।

সকাল থেকেই দলে দলে মিছিল নিয়ে ফরম সংগ্রহ করতে আসতে থাকেন মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। ব্যানার-ফেস্টুনসহ নানা বাদ্যযন্ত্রও রয়েছে তাদের বহরে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উৎসব মুখর হয়ে উঠে ধানমন্ডির আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়। সকাল ১০টার পর গোপালগঞ্জ-৩ সহ দুটি আসনে প্রতিদ্বিদ্বতা করতে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে ফরম সংগ্রহ করেন দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর জন্য রংপুর-৬ আসনের মনোনয়ন সংগ্রহ করেন ওবায়দুল কাদের। এরপর নিজের নোয়াখালী-৫ আসনের মনোনয়ন সংগ্রহ করেন কোম্পানিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। এরপরই ভীড় বাড়তে থাকে। মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা নিজের কর্মী ও সমর্থকদের এ কার্যালয়ের দিকে আসতে থাকেন। বিভিন্ন জেলা শহর থেকে বাস ভর্তি করে সমর্থকদের নিয়ে আসেন তারা। এ সময় তাদের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা মিছিল নিয়ে কার্যালয়ের সামনে এসে জড়ো হন।

তবে ভিড় এড়াতে কার্যালয়ের ভেতরে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে বেশি লোককে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ফলে কার্যালয়ের সামনে ৩ নম্বর সড়ক পর্যন্ত মানুষে পূর্ণ হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মানুষ এখন এক পর্যায়ে প্রধান সড়কে অবস্থান নেন। ট্রাফিক পুলিশ ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয়। দলে দলে মিছিল আসায় ধানমন্ডির সাতমসজিদ সড়ক এলাকায় তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। বাস থেকে লোকজনকে নেমে নির্দিষ্ট গন্তব্যে হেঁটে যেতে দেখা যায়।

মাদারীপুর-৩ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী সাংসদ বাহাউদ্দিন নাছিম আজই ফরম নেবেন। এ জন্য তার এক সমর্থক মো. শামীম রাতের লঞ্চে মাদারীপুর থেকে ঢাকায় এসেছেন। তিনি জানান, বড় মিছিল নিয়ে তারা সাতসকালে ধানমন্ডিতে এসেছেন। বিশাল শো-ডাউনের মাধ্যমে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন লক্ষীপুর-২ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী কুয়েত আওয়ামী লীগের আহবায়ক, কুয়েত বঙ্গবন্ধু স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা এবং এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান কাজী মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ বিশাল মিছিল নিয়ে তার ফরম সংগ্রহ করেন। নেতারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, বিএনপির দুর্গ হিসেবে খ্যাত এ আসনটি এবার কাজী শহিদ ইসলাম পাপুলের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ জয় করতে পারবে। জাতীয় পার্টিকে এবার ছাড় না দেবার বিষয়েও কেন্দ্রীয় সংগঠনের প্রতি অনুরোধ জানান তারা।

জাকজমকপূর্ণ মিছিলের মাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টি করেন ব্রাহ্মনবাড়িয়া-৬ আসনের এমপি ক্যাপ্টেন তাজুল ইসলাম। কয়েক হাজার নেতাকর্মীর মিছিলের মাধ্যমে পুরো এলাকা কাপিয়ে তোলেন তিনি। এছাড়া দুপুরের পর বড় ধরণের শো-ডাউন করে মনোনয়ন ফরম ক্রয় করেন নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের প্রার্থী মাহমুদ আলী রাতুল। রং বেরঙের ব্যানার, ফেস্টুন, প্লেকার্ড দিয়ে পুরো এলাকা ঘিরে ফেলেন তিনি। এ সময় তার মিছিলের ভীড়ে অন্য প্রার্থীদের অনুসারি নেতাকর্মীরা মিলিয়ে যায়। বিশাল মিছিল শো-ডাউন করে মনোনয়ন ফরম জমা দেন চাঁদপুর-৩ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী এবং মৎসজীবি লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক বিশিষ্ট ব্যবসায়ী রেদওয়াদ খান বোরহান। স্লোগানে স্লোগানে তার মনোনয়ন চান নেতাকর্মীরা।

কিশোরগঞ্জ-১ আসনে মনোনয়ন ফরম কিনেছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বর্তমান প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ এবং তার ভাই সৈয়দ সাফায়েতুল ইসলাম। চাঁদপুর-২ আসন থেকে অবিভক্ত ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া এবং তার ছেলে সাজেদুল হোসেন চৌধুরী দিপু। জাতীয় সংসদের উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী ফরিদুপর-২ আসনে, গাইবান্ধা-৫ এ ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, ফরিদপুর-১ আসনে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান, মাদারিপুর-৩ এ দলের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ, ফরিদপুর-৩ এ স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খোন্দকার মোশারফ হোসেন, শরিয়তপুর-২ এ সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক শামীম, চাঁদপুর-৩ এ ত্রাণ ও সমাজ কল্যাণ সম্পাদক সুজিৎ রায় নন্দী, রাজশাহী-৬ এ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, শরিয়তপুর-৩ এ নাহিম রাজ্জাক, চট্টগ্রাম-১৫ এ উপ-প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, অভিনত্রী রোকেয়া প্রাচী, ঢাকা-৫ আসনে এমপি হাবিবুর রহমান মোল্লা এবং তার ছেলে ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মোল্লা সজল মনোনয়ন ফরম কিনেছেন।

এছাড়া মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন, মৌলভীবাজার-৪ আসনে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ আব্দুল আহাদ, ফেনী-১ আসনে প্রধানমন্ত্রীর সাবেক প্রটোকল অফিসার আলাউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী নাসিম এবং মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল বাহার মজুমদার টিপু, ফেনী-২ এ নিজাম হাজারী, ফেনী-৩ এ বিএলএফ মুজিব বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা আকরাম হোসেন হুমায়ুন, কুমিল্লা-১ এ কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি সেলিনা ইসলাম, ঢাকা-১৫ আসনে বর্তমান এমপি কামাল আহমেদ মজুমদার, ঢাকা-৮ এ যুবলীগের ঢাকা মহাগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল চৌধুরী স¤্রাট, ঢাকা-৯ এ সেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন পলাশ। বগুড়া-৫(শেরপুর-ধুনট) আসনের মনোনয়ন তুলেছেন মহিলা আওয়ামী আইনজীবি পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও সহকারী এটর্নি জেনারেল জান্নাতুল ফেরদৌস রুপা, নেত্রকোনা-৫ এ লন্ডন যুবলীগের সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার তুহিন আহম্মদ খান, নেত্রকোনা-২ এ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুর রহমান লিটন (ভিপি লিটন), নেত্রকোনা ১ আসনে রোটারীয়ান আতাউর রহমান খান আখির,-সুনামগঞ্জ-২ আসনে সাংবাদিক দিপক চৌধুরী, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে সাবেক এমপি আবদুল্লাহ আল কায়সার হাসনাত, মুন্সীগঞ্জ-২ এ আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক এডভোকেট রানু আখতার, কিশোরগঞ্জ-২ আসনে ইঞ্জিনিয়ার এম এ মান্নান মনোনয়ন ফরম ক্রয় করেন।

সর্বশেষ দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট দুই হাজার ৬০৮ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম কিনেছিল। এবার সেই সংখ্যা চার হাজার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছেন দলটির নেতারা। আওয়ামী লীগের ৪ হাজারেরও বেশি মনোনয়ন প্রত্যাশী এক বছর ধরে নানাভাবে নিজেদের প্রচারণা চালিয়ে আসছেন। সেই হিসেবে গড়ে প্রতি আসনে ১৩ জন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী। এবার মনোনয়ন ফরমের মূল্য ২৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ হাজার টাকা করা হয়েছে। ফরম বিক্রি থেকে গতবার আওয়ামী লীগের তহবিলে জমা পড়েছিল প্রায় সাড়ে সাত কোটি টাকা। এবার তা দশ কোটি ছাড়িয়ে যাবে বলে দলটির নেতাদের প্রত্যাশা।

প্রসঙ্গত, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে বৃহস্পতিবার (৮ নভেম্বর)। তফসিল অনুযায়ী, নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ২৩ ডিসেম্বর (রোববার)। এ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন ১৯ নভেম্বর (সোমবার)। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের দিন ২২ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার)। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন ২৯ নভেম্বর (বৃহস্পতিবার)। এবারের সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ১০ কোটি ৪১ লাখ ৯০ হাজার ৪৮০, যা গত ৩১ জানুয়ারি হালনাগাদ করা ভোটারের থেকে ৪৮ হাজার ৯৯ জন বেশি। ফেব্রæয়ারি থেকে ১০ অক্টোবর- এই সময়ের মধ্যে নতুন ভোটার হয়েছেন প্রায় ৫০ হাজার।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


রাজনীতি ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন