অগ্নিপরীক্ষায় ইসি

দেশে প্রথমবারের মতো দলীয় সরকারের অধীনে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচন দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্নেষকরা। তাদের মতে, তিন দশক ধরে নির্বাচনের পদ্ধতি নিয়ে চলমান রাজনৈতিক মতবিরোধ উত্তরণের সুযোগ এবার সৃষ্টি হয়েছে। ইসি যদি নিরপেক্ষ থেকে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব বলিষ্ঠভাবে পালন করতে পারে তাহলে জনমনে ইতিবাচক ধারণা সৃষ্টি হবে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, যে কোনো দেশের তুলনায় আমাদের নির্বাচন কমিশনের আইনে ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষমতা যদি তারা যথাযথভাবে প্রয়োগ করে তাহলে সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার ইসির সামনে অগ্নিপরীক্ষা। তারা যথাযথ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে সব সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হতে পারে। নির্বাচনের রিটার্নিং অফিসারদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে. এম. নূরুল হুদাও বলেছেন, 'এবার নতুন প্রেক্ষাপটে ভোট হচ্ছে। এই নির্বাচনের সার্থকতার ওপর ভবিষ্যতে দলীয় সরকার বহাল রেখে নির্বাচন হবে কি-না তা নির্ভর করছে।'

ইসি-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর বেশ কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলেও তাতে ইসির ভূমিকা নিয়ে জনমনে যথেষ্ট ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি হয়নি। তাই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরে তাদের দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন ছিল। উল্টো একাধিক সিদ্ধান্ত ইসিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। নানা কারণে ইসির ব্যাপারে বিরোধীদলীয় নেতাদের মনে সন্দেহ বেড়েই চলেছে। অবশ্য ভিন্নমতও আছে অনেকের। তাদের মতে, ইসির একার পক্ষে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব নয়। এ জন্য সংশ্নিষ্ট সবাইকে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. এম সাখাওয়াত হোসেন শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠ ইসির নিয়ন্ত্রণে থাকবে কি-না সে সন্দেহ পোষণ করে বলেন, এখনও কিছুই শুরু হয়নি। অথচ ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের বিষয়ে পুলিশ খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে। পুলিশকে এ দায়িত্ব কে দিয়েছে, তা ইসির খতিয়ে দেখা উচিত। তিনি বলেন, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, ভোটের মাঠের নিয়ন্ত্রণ ইসির হাতে থাকবে না। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড বলতে যা বোঝায় তার কিছুই এখনও তৈরি হয়নি। এ পরিস্থিতিতে কীভাবে সুষ্ঠু ভোট করবেন তা ইসি সদস্যরাই ভালো বলতে পারবেন।

একই ধরনের মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক- সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি বলেন, তফসিল ঘোষণা থেকে এ পর্যন্ত নেওয়া পদক্ষেপে বলা যায়, ইসি সঠিক পথে নেই। তফসিলের পর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নেওয়া সব পদক্ষেপের পুরো দায়দায়িত্ব ইসির ওপর বর্তায়। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী তফসিল ঘোষণার পরেও গায়েবি মামলা দায়ের অব্যাহত রয়েছে। এ ব্যাপারে ইসির পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা যায়নি।

ড. বদিউল আরও বলেন, দেশের প্রায় সব উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন পদ যেমন ইউএনও, এসি ল্যান্ড ও থানার ওসি সবই বর্তমান এমপিদের পছন্দ অনুযায়ী ডিও লেটার (আধা সরকারি চাহিদাপত্র) দিয়ে পদায়ন করা। এসব এমপির বেশিরভাগই এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী হচ্ছেন। তাদের পরিবর্তন না করা হলে নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা যাবে না। অধিকাংশ দলের আপত্তির পরও ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

তবে সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক অবশ্য বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন। তার মতে, নির্বাচন কমিশনের একার পক্ষে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা সম্ভব নয়। এজন্য রাজনৈতিক দল, প্রার্থী ও তাদের সমর্থক এবং মাঠ প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা প্রয়োজন। তিনি বলেন, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের বিষয়টি অনেকাংশে আপেক্ষিকও বটে। কারণ এর আগে ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনেও হেরে যাওয়া দলগুলোর পক্ষ থেকে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এবারও হেরে যাওয়া দল নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলবে না- এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আবদুল মোবারক বলেন, দেশের প্রধান দুই জোটের দলীয় মনোনয়ন ফরম হাজার হাজার বিক্রি হচ্ছে। এটা নির্বাচনের পক্ষে অভূতপূর্ব জাগরণ। মাঠ প্রশাসনের সরকারি কর্মকর্তারা সাধারণত পক্ষপাতমূলক আচরণ করবেন না বলেই তিনি মনে করেন। বর্তমান কমিশনের এ পর্যন্ত নেওয়া সব পদক্ষেপকে সঠিক হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, সংবিধান ও আইনের বাইরে গিয়ে ইসির কাজ করার সুযোগ নেই।

ইসি সূত্র জানায়, ভোটের তফসিল ঘোষণার আগ থেকেই কমিশনের মধ্যে একধরনের অস্থিরতা কাজ করছিল। সরকারবিরোধী জোট সংলাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তফসিল ঘোষণা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানালেও তারা সেটাকে গুরুত্ব দেননি। খোদ কমিশনের একজন সদস্য ভোট জানুয়ারিতে নেওয়ার প্রস্তাব করলে অন্যরা তার বিপক্ষে অবস্থান নেন। ইসি কর্মকর্তারা জানান, ভোট না পেছানোর বিষয়ে বিশ্ব ইজতেমা ও জানুয়ারিতে নতুন ভোটার হওয়ার যুক্তি দেখানো হয়। অথচ পুনর্নির্ধারিত তফসিলের আগেই বিশ্ব ইজতেমা পিছিয়ে দেওয়ার ঘোষণা আসে এবং জানুয়ারিতে নতুন ভোটার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ আইন অনুযায়ী নতুন ভোটারদের নাম তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় ৩১ জানুয়ারির পরে। এ ছাড়া আইনে সর্বশেষ হালানাগাদকৃত তালিকায় ভোট অনুষ্ঠানের জন্য ইসিকে ক্ষমতা দেওয়া রয়েছে।

এদিকে তফসিলের পরও 'গায়েবি' মামলা ও গ্রেফতার অব্যাহত থাকলেও ইসি কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। বিএনপির অভিযোগ, তফসিলের পরেই সাত শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ৮ নভেম্বর তফসিল ঘোষণার পরে আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রিকে কেন্দ্র করে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের কারণে দু'জন নিহত হয়। এসব ঘটনায় ইসি নির্বিকার থাকে। অন্যদিকে বিএনপি অফিসের সামনে একই ইস্যুতে আচরণবিধি লঙ্ঘন রোধে পুলিশকে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দেয় ইসি।

এসব অভিযোগের জবাবে কমিশনার রফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, কমিশনের সামনে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তা নেওয়া হবে এবং সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নতুন পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি-না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে তারা আইনি কাঠামোকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। কারণ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন যেভাবে হওয়া উচিত, আইনি কাঠামো সেভাবেই নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। ইসি শুধু তা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে। এর বাইরে যাওয়ার উপায় ইসির নেই।

বিএনপির পক্ষ থেকে দেওয়া মামলার তালিকা ও মাঠ প্রশাসনে রদবদলের বিষয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, তাদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে ইসি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে। এ ছাড়া মামলার তালিকায় এক নম্বরে আদালতের দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এবং দুই নম্বরে খুনের মামলার আসামি থাকলে কমিশনের কিছুই করার নেই। তফসিলের পরে গায়েবি মামলার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তফসিলের পরে কেউ খুন হলে মামলা নেওয়া যাবে না- এমন তো কোনো কথা নেই।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


রাজনীতি ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন