আ'লীগকে চাপে রাখার কৌশল ক্ষুব্ধ এরশাদের

প্রত্যাশিত সংখ্যক আসনে ছাড় পাওয়ার নিশ্চয়তা না পেয়ে আওয়ামী লীগকে চাপে রাখার কৌশল নিয়েছে মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টি (জাপা)। দলটির সূত্র জানিয়েছে, সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে জাপা। মহাজোট ভাঙার সম্ভাবনা ক্ষীণ। আওয়ামী লীগকে চাপে রেখে বাড়তি আসন আদায় করতেই ২০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে জাপা।

আওয়ামী লীগের কাছে ৭৬ আসন চেয়েছিল সংসদের বিরোধী দল জাপা। তা না পেয়ে এরশাদের চাওয়া ছিল অন্তত ৫০ আসন। কিন্তু গত রোববার ২৩১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালিকা ঘোষণার পর স্পষ্ট হয় জাপা প্রত্যাশিত সংখ্যক আসনে ছাড় পাচ্ছে না। এতে ক্ষুব্ধ জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। প্রত্যাশিত সংখ্যক আসন নিশ্চিতে আওয়ামী লীগের ওপর চাপের কৌশল নিয়েছে জাপা। জাপার কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের দাবি করেন, তিনি কিছুই জানেন না। তিনি বলেন, কতটি আসন জাপা পাচ্ছে তা স্পষ্ট নয়।

৩৬ আসনে জাপার এমপি রয়েছে। এর আটটিতে প্রার্থী ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ। বাকি ২৮টি জাপার জন্য ফাঁকা রেখেছে। জাপার চাহিদা তালিকায় আরও দুটি আসন ফাঁকা রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে গতকাল পর্যন্ত মাত্র ৩২টি আসনে মহাজোটের মনোনয়নের নিশ্চয়তা পেয়েছেন এরশাদ। তিনি ঢাকা-১৭ ও নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে প্রার্থী হতে চান। এ দুটি আসনেও প্রার্থী ঘোষণা করেছে আওয়ামী লীগ।

প্রত্যাশিত সংখ্যক আসন না পেয়ে ক্ষুব্ধ এরশাদ গত রোববার রাতে জাপা নেতাদের নির্দেশ দেন, ১০০ আসনে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করতে। কিন্তু গতকাল সোমবার বনানীতে জাপা চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে দলের মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ২০০ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করবেন জাপার প্রার্থীরা। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোটগতভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। গতকাল জাপার প্রার্থী তালিকা প্রকাশের কথা ছিল। রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, 'কৌশলগত কারণে' তারা প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করছেন না। গতকাল মহাজোটের প্রার্থী তালিকা প্রকাশের দিন ছিল। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, 'কৌশলগত' কারণে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

মহাজোটের সূত্র জানিয়েছে, আসন ভাগাভাগির রফা না হওয়ায় প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়নি। জাপার সঙ্গে সমন্বয় করে তালিকা দেওয়া হবে। আগামী ৯ ডিসেম্বর মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। তার আগেই সমঝোতা হবে। সংবাদ সম্মেলনে একই কথা বলেন, রুহুল আমিন হাওলাদার। এ সময় দলীয় কর্মীরা ৩০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার পক্ষে স্লোগান দেন। জাপা মহাসচিব বলেন, তারা মহাজোট থেকেই ভোটে অংশ নেবেন। জোট ভাঙবে না।

সংবাদ সম্মেলনের পর জাপা মহাসচিব তার কক্ষে আলাপচারিতায় বলেছেন, আওয়ামী লীগ ৪৫ আসন ছাড়তে রাজি হয়েছে। জাপার সূত্র গত রোববার মধ্যরাতে সমকালের কাছে একই দাবি করে। তবে এ আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে পারছেন না মনোনয়নপ্রত্যাশীরা। তাদের অভিযোগ, ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাপাকে ৪৯ আসন দিয়েও আওয়ামী লীগ এর ২০টিতে প্রার্থী রেখে দেয়। এর ১৩টিতে জামানত হারায় জাপা।

জাপার একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য জানিয়েছেন, ৪৫ আসন দিলেও কয়েকটি আসন উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এতে তারা ক্ষুব্ধ। পার্বত্য এলাকার একটি আসন থেকে নির্বাচনে প্রস্তুতি নেওয়া এ নেতা জানান, তার আসনও উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগ ও জাপা দুই দলেরই প্রার্থী থাকবে।

ঢাকা-১ আসনও উন্মুক্ত থাকতে পারে। এ আসনে জাপার প্রার্থী ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে হারিয়ে জয়ী হওয়া সালমা ইসলাম। আওয়ামী লীগ এ আসনে প্রার্থী করেছে সালমান এফ রহমানকে। এরশাদ চেষ্টা করছেন এ আসনটি পেতে।

আসন ভাগাভাগি নিয়ে ক্ষোভ থাকলেও এরশাদের ঘনিষ্ঠ নেতারা জানিয়েছেন, মহাজোট ছাড়বে না জাপা। এরশাদ চেষ্টা করছেন, ২০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে আওয়ামী লীগের ওপর চাপ সৃষ্টির চেষ্টা করতে। ৫০ আসনের দাবি থাকলেও ৪২-৪৩ আসন পেলেই সন্তুষ্ট থাকবেন তারা। এর কমে মানতে চান না। এ ছাড়া জাপার শর্ত তাদের দেওয়া কোনো আসনে অতীতের মতো আওয়ামী লীগের প্রার্থী রাখতে পারবে না। প্রার্থী চূড়ান্ত করার আগেই আওয়ামী লীগকে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে হবে।

জাপার একজন প্রেসিডিয়াম সদস্য সমকালকে নিশ্চিত করেছেন, ২০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা শুধুই কৌশল। মহাজোটের মনোনয়ন পাওয়ার নিশ্চয়তা পাওয়া এ নেতা বলেছেন, হাতে সময় মাত্র দুটি দিন। ২০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার সময় আর নেই। মহাজোটের মনোনয়ন পেতে আগ্রহী প্রার্থী থাকলেও জাপা একক নির্বাচন করলে প্রার্থী হবেন এমন আগ্রহীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। বৃহত্তর রংপুরের বাইরে মহাজোটের মনোনয়ন ছাড়া জাপার টিকিটে নির্বাচন করার মতো প্রার্থী নেই। কারণ, একক নির্বাচন করলে ফলাফল খুব খারাপ হবে।

জাপার দখলে থাকা ৩৬ আসনের মধ্যে পটুয়াখালী-১, চট্টগ্রাম-৯, জামালপুর-৪, ময়মনসিংহ-৭, ঢাকা-১, সিলেট-৫, কুমিল্লা-২ ও কক্সবাজার-১ আসনে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। বাকি ২৮ আসন ছাড়াও লালমনিরহাট-৩ আসনে জিএম কাদের এবং ফেনী-৩ আসনে লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর মহাজোটের মনোনয়ন নিশ্চিত বলে দাবি করেছেন জাপা চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়া।

দখলে থাকা ৩৬টির দুটি বাদে বাকিগুলো চায় জাপা। এ ছাড়া ঢাকা-১৭, নারায়ণগঞ্জ-১, জামালপুর-২, টাঙ্গাইল-৫, চট্টগ্রাম-১২, নোয়াখালী-১, রংপুর-২, রংপুর-৪, রংপুর-৫, লালমনিরহাট-১, নীলফামারী-১, নীলফামারী-৪, নাটোর-৪, ঠাকুরগাঁও-৩, দিনাজপুর-৬, খুলনা-১ এবং সাতক্ষীরা-১ সহ মোট ৫০ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন চায় জাপা।

দলটির সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা-১৭ অথবা নারায়ণগঞ্জ-১ এ দুটি আসনের যে কোনো একটি পাবে জাপা। এখানে এরশাদ প্রার্থী হতে চান। বাকিগুলোর মধ্যে নীলফামারী-১, ঠাকুরগাঁও-৩, রংপুর-২, রংপুর-৫ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন পেতে পারে জাপা। আওয়ামী লীগ যদি প্রার্থী তালিকা পরিবর্তন না করে তবে সব মিলিয়ে ৩৫টির বেশি আসন ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা কম জাপার। যদিও জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য সুনীল শুভ রায় গতকাল দাবি করেন তিনি খুলনা-১ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন পেয়েছেন। বরিশাল-২ আসনে চিত্রনায়ক সোহেল রানা মহাজোটের সমর্থন পেয়েছেন বলে দাবি করা হয়।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


রাজনীতি ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন