৩০০ আসনে ৩০৫৬ মনোনয়ন জমা

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ৩০০ আসনে ৩ হাজার ৫৬ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী বুধবার ছিল মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন।

গতকাল রাতে নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ সারাদেশের রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয় থেকে পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে এ কথা বলেন।

সারাদেশে নির্বাচন কমিশনের আটটি আঞ্চলিক নির্বাচনী কার্যালয় রয়েছে। রংপুর অঞ্চলে মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে ৩৬১, ঢাকায় ৭০৮, রাজশাহীতে ৩৫৩, খুলনায় ৩৫১, বরিশালে ১৮২, ময়মনসিংহে ২৩৬, সিলেটে ১৭৭ ও চট্টগ্রামে ৬৮৮টি। এর মধ্য ঢাকা -১৭ আসনে সবচেয়ে বেশি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে ২৭টি। আর মাগুরা-২ আসনে সবচেয়ে কম ৪টি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছে।

এর আগে ১৯৯১ সালে ৫ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি মনোনয়নপত্র জমা পড়েছিল। সেবার ছিল ৩ হাজার ৮৫৫টি। এ ছাড়া ১৯৯৬ সালে সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ৩ হাজার ৯৩, ২০০১ সালে অষ্টম সংসদে ২ হাজার ৫৬৩, ২০০৮ সালে নবম সংসদে ২ হাজার ৪৬০ এবং দশম সংসদ নির্বাচনে ১ হাজার ১০৭ জন প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন।

এই ৩ হাজার ৫৬টি মনোনয়নপত্র ২ ডিসেম্বর বাছাই করবেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এরপর কেউ যদি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে চান, তাদের জন্য ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় থাকছে।

প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় ফুরোনোর শেষে প্রতীক বরাদ্দের পর শুরু হবে প্রচার। প্রচার শেষে আগামী ৩০ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণ হবে।

দশম সংসদ নির্বাচন বিএনপিসহ অধিকাংশ দলের বর্জনের মধ্যে অনুষ্ঠিত হলেও এবার সব দলের অংশগ্রহণে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন আশা করা হচ্ছে।

নির্বাচন কমিশন এবং সরকারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ করে এলেও বিএনপি ও তাদের মিত্র রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, তাদের মনোনীত প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে।

এর আগে বুধবার উৎসবমুখর পরিবেশে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা বিভাগীয় কমিশনার, রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র জমা দেন।

এরমধ্যে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে গতকাল সকালে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন ঢাকা-১০ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। পরে একে একে মনোনয়নপত্র জমা দেন ঢাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাহারা খাতুন, সাদেক খান এবং আসলামুল হক।

বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে ঢাকা-১৩ আসনে আবদুস সালাম, ঢাকা- ১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ডাক্তার ফরহাদ হালিম মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের পক্ষে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী ও জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মশিয়ার রহমান রাঙ্গা।

শেরপুর-২ আসনে কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। মাদারীপুর-২ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেন নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান। সিরাজগঞ্জ-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী প্রফেসর ডাক্তার হাবিবে মিল্লাত মুন্না, সিরাজগঞ্জ-৪ এ তানভীর ইমাম মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন।

টাঙ্গাইল-৮ (সখীপুর-বাসাইল) আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম নেতা বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম ও তার মেয়ে কুঁড়ি সিদ্দিকী।

এ আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির (এরশাদ) কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক কাজী আশরাফ সিদ্দিকী ও কেন্দ্রীয় কমিটির এনজিওবিষয়ক সম্পাদক রেজাউল করিম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের উপজেলা কমিটির সভাপতি মাওলানা আবদুল লতিফ মিয়া, স্বতন্ত্র প্রার্থী লিয়াকত আলী মনোনয়নপত্র জমা দেন।

চাঁদপুর-৩ আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার দীপু মনি। এছাড়া এ আসনে বিএনপির প্রার্থী শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক এবং চাঁদপুর-১ আসনে বিএনপির মোশারফ হোসেন মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।

রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক মনোনয়ন জমা দিয়েছেন কুমিল্লা-১১ আসনে। এছাড়া ১০ আসনে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল লোটাস, ৫ আসনে সাবেক আইনমন্ত্রী আব্দুল মতিন খসরু এবং ৬ আসনে হাজী আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার মনোনয়ন জমা দেন। আর বিএনপির প্রার্থী হয়ে কুমিল্লা-১ আসনে সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এবং ৬ আসনে হাজী আমিনুর রশিদ ইয়াছিন মনোনয়ন জমা দেন।

কুষ্টিয়া-৩ আসনে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ বুধবার মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। কুষ্টিয়া-৪ আসনে মনোনয়ন জমা দেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিম আলতাফ জর্জ।

ভোলা-১ আসনে বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, ২ আসনে আলী আজম মুকুল, ৩ আসনে নূরুন্নবী চৌধুরী শাওন এবং ৪ আসনে আব্দুল আল ইসলাম জ্যাকব মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।

জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার পক্ষে নড়াইল-২ আসনে মনোনয়ন জমা দেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এ আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন ২০ দলের প্রার্থী ডক্টর ফরিদুজ্জামান ফরহাদ। নড়াইল-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কবিরুল হক মুক্তি, মহাজোটের শরিক দল জাসদ একাংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া এবং বিএনপির প্রার্থী আলম মনোনয়ন জমা দিয়েছেন।

বরিশালেও রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে সকাল থেকে ছিল উপচেপড়া ভিড়। ৫ আসনে মনোনয়ন জমা দেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল জাহিদ ফারুক শামীম এবং বিএনপির এবায়দুল হক চান। বরিশাল-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলহাজ আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহর পক্ষে মনোনয়ন জমা দেন তার ছেলে সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদেক আব্দুল্লাহ। অন্যান্য আসনেও আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অন্যান্য দলের প্রার্থীরা তাদের মনোনয়ন জমা দেন।

দিনাজপুর-৩ আসনের জন্য জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে মনোনয়ন জমা দেন জাতীয় সংসদের হুইপ ইকবালুর রহিম। বিরল উপজেলা সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে দিনাজপুর-২ আসনের মনোনয়ন জমা দেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়া দিনাজপুর-৫ আসনে মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার, ১ আসনে মনোরঞ্জন শীল গোপাল এবং ৬ আসনে শিবলী সাদিক মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

নাটোর-২ আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম শিমুল। এছাড়া মনোনয়ন জমা দেয়ার শেষ দিনে নাটোর-১ আসনে শহীদুল ইসলাম বকুল এবং ৪ আসনে অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দেন।

নীলফামারী জেলার ৪টি সংসদীয় আসনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা মনোনয়ন দাখিল করেছেন। দুপুরে দেড়টার দিকে নীলফামারী-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর মনোনয়ন জমা দেন। এর আগে একই আসনে বিএনপি প্রার্থী শামসুজ্জামান মনোনয়ন জমা দেন।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, আফসারুল আমিন ও এম এ লতিফ। অন্যদিকে বিএনপির প্রার্থী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মোরশেদ খান ও আবদুল্লাহ আল নোমান মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

কিশোরগঞ্জ-১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের পক্ষে মনোনয়ন জমা দেন তার ৪ ভাই-বোন। এ আসনে বিএনপি থেকে সাবেক জজ রেজাউল করিম খান চুন্নু মনোনয়নের চিঠি জমা দেন।

সিলেট-১ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন ফরম দাখিল করেছেন জাতিসংঘ বাংলাদেশ মিশনের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত ড. এ কে আবদুল মোমেন। এ সময় বড় ভাই অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত তার সঙ্গে ছিল। আর সিলেট-৬ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সিলেট-১ আসনে বিএনপি প্রার্থী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির ও সিলেট-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী দিলদার হোসেন সেলিম মনোনয়ন ফরম দাখিল করেন।

খালেদার ৩ আসনে

বিকল্প প্রার্থী

এদিকে দুর্নীতি মামলায় দ-িত খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল হলে তার তিন আসনে বিকল্প প্রার্থী হিসেবে লড়তে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ তিনজন।

এর মধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল তার নিজের আসন ঠাকুরগাঁও-১ এর পাশাপাশি খালেদা জিয়ার আসন বগুড়া-৬ (সদর) এর জন্য মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

আর খালেদার বগুড়া-৭ (গাবতলী-শাজাহানপুর) আসনে বিকল্প প্রার্থী হয়েছেন গাবতলী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মোরশেদ মিল্টন। ফেনী-১ (পরশুরাম-ফুলগাজী-ছাগলনাইয়া) আসনে খালেদা জিয়ার পাশাপাশি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের সভাপতি রফিকুল ইসলাম মজনুর মনোনয়নপত্র জমা দেয়া হয়েছে।

হাইকোর্টের এক রায়ে খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশ নেয়ার পথ আটকে যাওয়ার পর বুধবার মনোনয়ন জমার শেষদিনে বিএনপির পক্ষ থেকে বিকল্প প্রার্থী দেয়া হয়।

জিয়া এতিমখানা ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ১০ বছর এবং জিয়া দাতব্য ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় ৭ বছরের দ- নিয়ে গত ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া।

বিএনপি নেতারা আশা করছিলেন, রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে তিনি ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। ফেনী ও বগুড়ার তিনটি আসন থেকে তাকে ধানের শীষের মনোনয়নও দেয়া হয়েছিল।

কিন্তু মঙ্গলবার হাইকোর্টে এক মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কারও দুই বছরের বেশি সাজা বা দ- হলে সেই দ- বা সাজার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না, যতক্ষণ না আপিলে ওই দ- বাতিল বা স্থগিত হয়।

এর ফলে খালেদা জিয়াসহ বেশ কয়েকজন বিএনপি নেতার আপিল করে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ আটকে যায়। মনোনয়নপত্র জমার শেষদিনে বুধবার ঠাকুরগাঁওয়ে গিয়ে নিজের আসনে মনোনয়নপত্র জমা দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল। পরে সৈয়দপুরে গিয়ে খালেদা জিয়ার বিকল্প হিসেবে বগুড়া ছয় আসনের মনোনয়নপত্রে তিনি সই করেন।

বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য বগুড়া জেলা বিএনপির সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম বগুড়ার রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে খালেদা ও ফখরুলের মনোনয়নপত্র জমা দেন।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


রাজনীতি ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন