আপিলে বিভক্ত রায়ে খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল

বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিলে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তিনটি আসনেই তাঁর প্রার্থিতা অবৈধ ঘোষণা করেছে তারা। গতকাল শনিবার আপিল আবেদনের তৃতীয় দিনের শুনানিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ কমিশনারদের ভোটের ভিত্তিতে বেগম খালেদা জিয়ার আপিল নামঞ্জুর করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা। অথচ সাজার পর ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জেল হোসেন চৌধুরী মায়া, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, চিপ হুইপ আসম ফিরোজ, আওয়ামী লীগ নেতা হাজী সেলিমের মনোনয়ন বৈধ : করেছে ইসি। : এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল শুনানির আগে নির্বাচন কমিশনকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। গতকাল শনিবার দুপুরে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানকের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ইসিতে যায়। প্রতিনিধিদলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ। এ সময় তারা কোনো ধরনের চাপের মুখে নতি স্বীকার না করতে নির্বাচন কমিশনকে হুঁশিয়ার করেন। এ সময় নানক সাংবাদিকদের বলেন, সংবিধানের বাইরে গিয়ে নির্বাচন কমিশনের কিছু করার নেই। তিনি বলেন, কোনো চাপের কাছে যেন নির্বাচন কমিশন নতি স্বীকার না করে, সে জন্য ইসিকে আমরা সতর্ক করে দিয়েছি।

নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে শুধু মাহবুব তালুকদার বেগম খালেদা জিয়ার মনোনয়ন বাতিলের বিপক্ষে রায় দেন। কিন্তু অন্য তিন কমিশনার রফিকুল ইসলাম, শাহাদাত হোসেন ও কবিতা খানম মনোনয়ন বাতিলের পক্ষে রায় দেন। সিইসি সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। এর আগে সকালে আপিল শুনানি শুরু হলে, বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন তাঁর আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী। তিনি প্রায় ২০ মিনিট সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে যুক্তি তুলে ধরেন। কিন্তু তখন শুনানি স্থগিত রাখা হয় বিকেল পর্যন্ত। পরে বিকেল ৬টায় এই ফলাফল জানানো হয়। কারাবন্দি বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে ফেনী-১, বগুড়া-৬ ও বগুড়া-৭ আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দেয়া হয়। দুটি মামলায় তিনি দণ্ডিত হওয়ায় রিটার্নিং কর্মকর্তারা তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল বলে ঘোষণা করেন। এরপর গত ৫ ডিসেম্বর বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা তাঁর পক্ষে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল আবেদন করেন। বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে আপিলের শুনানি করেন তাঁর আইনজীবী অ্যাডভোকেট এ জে মোহাম্মদ আলী। এ সময় সেখানে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনসহ অন্য আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।

শুনানিতে বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলেন, আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া তিনটি আসন থেকে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। রিটার্নিং কর্মকর্তারা ১২/১ (ঘ) অনুসারে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল করেছেন। আইনজীবীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের কাছে জানতে চান, বেগম খালেদা জিয়া বর্তমানে কারাগারে আছেন। তিনি কীভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করলেন বা নির্বাচনী অপরাধ করলেন? আর এই কারণে কীভাবে বেগম খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়? বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিলের কারণ হিসেবে রিটার্নিং কর্মকর্তারা যা দেখিয়েছেন, সে অনুসারে বেগম খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল সঠিক হয়নি। সে কারণে কমিশনের কাছে আপিল করা হয়েছে। তাঁরা বলেন, প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রয়েছে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার। সেই ক্ষেত্রে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বেগম খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার কোনো সুযোগ নেই। তারপরও, আইনগতভাবে বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অধিকার রাখেন। যে আদেশ রিটার্নিং কর্মকর্তারা দিয়েছেন, আইনের দৃষ্টিতে তা বৈধ নয়। আমরা মনে করি নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে যথাযথ আদেশ দেবে। এবং রিটার্নিং কর্মকর্তারা যে আদেশ দিয়েছেন, কমিশন তা বাতিল করবে। আমরা আশা করি, আগামী নির্বাচনে বেগম খালেদা জিয়া অংশ নেবেন। ২০ মিনিটের শুনানিতে নির্বাচন কমিশন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় তা স্থগিত রাখা হয়। কমিশন জানায়, বিকেল ৫টায় বেগম খালেদা জিয়ার আবেদনের ওপর আবার শুনানি হবে। শুনানির অংশ হিসেবে বিকেলে আবার বেগম খালেদা জিয়ার আপিলের বিষয়টি আসে। এ সময় বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে আইনজীবীরা এ জে মোহাম্মদ আলী, জয়নুল আবেদীন ও মাহবুব উদ্দিন খোকন যুক্তিতর্কে অংশ নেন। তাঁরা আইনের ধারা উল্লেখ করে বেগম খালেদা জিয়ার পক্ষে রায় দাবি করেন। এ সময় আওয়ামী লীগের উপদেষ্টাপরিষদের সদস্য ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ও আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য রিয়াজুল কবির কাউসার বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের বিপক্ষে মত তুলে ধরেন। এ সময় কোনো পক্ষের আইনজীবী না হওয়ার পরও ইউসুফ হোসেনের বক্তব্যের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এ জে মোহাম্মদ আলী। তাঁকে উদ্দেশ করে এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘হু আর ইউ? ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন ছাড়াও আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের বেশ কয়েকজন আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন।

এই ঘটনার পরপরই নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার বলেন, রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক যথাক্রমে ফেনী-১, বগুড়া ৭ ও ৮ এ বেগম খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিলের বিরুদ্ধে যে আপিল দায়ের করা হয়েছে তা আইনগত বিশ্লেষণ করে আমার রায় এই আপিল মঞ্জুরের পক্ষে। আমি এই আপিল মঞ্জুর করলাম। মাহবুব তালুকদারের বক্তব্যের পরপরই বিএনপির আইনজীবীরা উল্লাস করে নির্বাচন কমিশনের কোর্ট রুমের পেছনের দিকে চলে যাওয়া শুরু করেন। অপরদিকে আওয়ামী আইনজীবীরা এর বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে শুরু করেন। এ সময় নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ বলেন, আপনারা ঠান্ডা হয়ে বসেন। এই রায় পূর্ণাঙ্গ নয়, এটি মাত্র একজনের রায়। তখন উত্তপ্ত আদালত কক্ষেই কমিশনার রফিকুল ইসলাম তাঁর রায় ঘোষণা শুরু করেন। তিনি বলেন, সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দণ্ডপ্রাপ্তরা নির্বাচন করতে পারেন না। এ কারণে বেগম খালেদা জিয়ার আপিল নামঞ্জুর করা হলো। এরপর কমিশনার শাহাদাত হোসেন চৌধুরীও একই রায় দেন। কমিশনার কবিতা খানমও এই দুই কমিশনারের পক্ষে মত দিয়ে বলেন, বেগম খালেদা জিয়া দণ্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে আছেন। সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে নৈতিক স্খলন জনিতকারণে দণ্ডিত হয়েছেন এবং তিনি (খালেদা জিয়া) এখনো কারাগারে আছেন। তাঁর দণ্ড স্থগিত হয়নি। আমরা বলতে চাই তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ায় এবং রিটার্নিং অফিসাররা যে আদেশ দিয়েছেন, তার স্পিরিট বিবেচনা করে সেই অনুযায়ী আপিল না মঞ্জুর করছি। এরপর প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা বলেন, আমি আমার কমিশনার রফিকুল ইসলাম, শাহাদাত হোসেন ও কবিতা খানমÑ এই তিনজনের পক্ষে রায় দিলাম। এই আপিল আবেদন মঞ্জুর হয়নি। পরে ইসি সচিব বলেন, ৪-১ ভোটে এই আপিল নামঞ্জুর হলো। শুনানি শেষে বেরিয়ে তখন অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচনকালীন আচরণবিধি বা অপরাধের যে ধারায় বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ বেআইনি। কারান্তরীণ বেগম খালেদা জিয়া কীভাবে বিধি লঙ্ঘন করবেন তার বিরুদ্ধে যুক্তি দেয়া হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার থেকে ইসিতে আপিল শুনানি শুরু হয়। আজ ৯ ডিসেম্বর প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময়। ১০ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ। আর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে ৩০ ডিসেম্বর।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


রাজনীতি ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন