রুদ্ধশ্বাস ম্যাচে হার বাংলাদেশের

শেষ ৫ ওভারে দরকার ৩৮ রান, লক্ষ্যটা কঠিন কিছু ছিল না। সেঞ্চুরিয়ান সাই হোপ যেভাবে খেলছিলেন, ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলও ছিল নির্ভার। তবে ৪৬তম ওভারে ৩ রান দিয়ে সাকিব আর ৪৭তম ওভারে ৩ রান দিয়ে মুস্তাফিজ ম্যাচে আনেন রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনা। সমীকরণ তখন ৩ ওভারে ৩২। এতেও শেষ রক্ষা হলো না। রুবেলের ১০ রানের ওভারে হারের শঙ্কা প্রবল হলো। মুস্তাফিজও নিজের শেষ ওভারে ছন্দ হারালেন, ১৬ রান দিয়ে ম্যাচটা তুলে দিলেন ক্যারিবীয়দের হাতে। শেষ ওভারে ৬ রান হাতে নিয়ে অতিথিদের আটকে রাখতে পারেননি মাহমুদউল্লাহ। মিরপুরে মঙ্গলবার রুদ্ধশ্বাস লড়ইয়ের পর তাই ৪ উইকেটের হারই সঙ্গী বাংলাদেশের। তাতে সিরিজে ফিরেছে ১-১ সমতা। শুক্রবার সিলেটে অনুষ্ঠেয় তৃতীয় ম্যাচটি এখন তাই অলিখিত ফাইনাল।

মাইলফলক ছোঁয়া ম্যাচে আলো ছড়াল পঞ্চপা-ব, বিশেষ করে ব্যাটিংয়ে। কিন্তু ব্যাটিংয়ের শেষটায় ঝড় উঠেনি, তাই প্রত্যাশিত মাত্রা পায়নি দলের পুঁজি। তবে মিরপুর শেরেবাংলার রহস্যময় পিচে ২৫৫ রানই বা কম কিসে? লড়াই করার জন্য বোলারদের হাতে পর্যাপ্ত রসদই মজুদ ছিল। বোলিংয়ের শুরুটাও ছিল স্বপ্ন জাগানিয়া। কিন্তু একজন সাই হোপ-পরবর্তী সময়ে স্বপ্নটাকে রঙিন হতে দিলেন না। একপ্রান্ত আগলে সেঞ্চুরি হাঁকালেন, ১২টি চার আর ৩টি ছক্কায় ১৪৪ বলে ১৪৬ রানের দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলার পথে সতীর্থদের আসা যাওয়ার মাঝেও হানলেন প্রতিঘাত। দুই বল হাতে রেখেই জয়ের বন্দরে ক্যারিবীয়রা।

ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই চন্দরপল হেমরাজকে ফিরিয়েছিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। এরপর ড্যারেন ব্রাভোকে (২৭) নিয়ে ৬৫, মারলন স্যামুয়েলসকে (২৬) নিয়ে ৬২ রানের অসাধারণ দুটো জুটি গড়ে ম্যাচটাকে বাংলাদেশের জন্য কঠিন করে তোলেন হোপ। বোলিংয়ে প্রথম ম্যাচে জাদুর ঝাঁপি খুলে দিয়েছিল টাইগাররা, এ দিন তা পারেনি। উইকেটহীন থাকা সাকিবই কেবল সমীহ পেয়েছেন ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানদের থেকে। তবে মিরাজ-মুস্তাফিজ-মাশরাফি-রুবেলদের বোলিং থেকে প্রয়োজনীয় রানটা ঠিকই বের করে নিয়ে গেছে অতিথিরা। মিস ফিল্ডিং আর ক্যাচ ফেলার দায়ও চুকাতে হয়েছে বাংলাদেশকে।

ম্যাচের শেষটা হয়েছে রোমাঞ্চকর। এই রোমাঞ্চের বীজ বোনা হয়েছিল ১৫৫ রানের মাথায় যখন শিমরন হেটমায়ারকে (১৪) নাজমুল অপুর ক্যাচ বানিয়ে ফেরান রুবেল হোসেন। ঠিক এর পরের ওভারেই প্রতিপক্ষ দলপতি রোভম্যান পাওয়েলকে ফিরিয়ে দেন মাশরাফি। দারুণ এক ডেলিভারিতে রোস্টন চেসকে লংঅনে তামিমের ক্যাচ বানিয়ে মুস্তাফিজ যখন ম্যাচে দ্বিতীয় উইকেট শিকারের আনন্দে মাতেন ক্যারিবীয়দের রান তখন ৬ উইকেটে ১৮৫। কেমো পলকে (১৮*) সঙ্গী করে সেখান থেকে আবার হোপের প্রতিঘাত, তাদের ৭১ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটিতেই জয়ের বন্দরে ক্যারিবীয়রা, ফিকে হয় বাংলাদেশের স্বপ্ন।

শেষের মতো এদিন ম্যাচের শুরুটাও ভালো ছিল না বাংলাদেশের। ওশান থমাসের বলে গোড়ালিতে আঘাত পেয়ে দ্বিতীয় ওভারে স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়েন লিটন দাস। ম্যাচে ৩ উইকেট নেয়া এই পেসারেরই পরের ওভারে আউট ইমরুল কায়েস। আগের ম্যাচের মতো এ দিনও ব্যর্থ এই বাঁহাতি, এদিন রানের খাতাই খোলতে পারেননি। শুরুর ওই জোড়া ধাক্কা বাংলাদেশ সামলে উঠে তামিম আর মুশফিকের চওড়া ব্যাটে। তাদের ১১১ রানের জুটিতে পায়ের নিচে শক্ত মাটি খুঁজে পায় টাইগাররা। এই নিয়ে পঞ্চমবার শতরানের জুটি গড়লেন তারা। ওয়ানডেতে আর কোনো জুটির থেকে পাঁচটি শতরান দেখেনি বাংলাদেশ।

শুরু থেকেই আস্থার সঙ্গে খেলেছেন তামিম। বাহাতি ওপেনার ৪৩তম হাফ সেঞ্চুরি তুলে নেয়ার পথে এ দিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ঢুকেছেন ১২ হাজার রানের ক্লাবে। কাঁটায় কাঁটায় ৫০ রানের ইনিংসে সাকিবের পর মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে পূর্ণ করেছেন চার হাজার আন্তর্জাতিক রান। খেলেছেন বাহারি সব শট। তার ৬৩ বলের ইনিংসে ছিল ৪টি চার আর একট ছক্কার মার। পাঁচটি চারের মারে ৮০ বলে খেলা ৬২ রানের ইনিংসে মুশফিক ছিলেন আরও সাবলীল। প্রথম ওয়ানডে যেখানে শেষ করেছিলেন, এ দিন যেন সেখান থেকেই শুরু করেছিলেন।

যেভাবে খেলে চলেছিলেন, মনে হচ্ছিল সেঞ্চুরিটাও পেয়ে যাবেন মুশফিক। কিন্তু থমাসের অফস্টাম্পের বাইরের বল তাড়া করতে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন উইকেটের পেছনে। তামিমের আউটটা ছিল আরও দৃষ্টিকটু। ৩০ রান করা মাহমুদউল্লাহ নিজের উইকেট উপহার দিয়েছেন, দলের পুঁজিতে সর্বোচ্চ ৬৫ রানের জোগান দেয়া সাকিবও তাই। ৭ রানের ব্যবধানে তামিম আর মুশফিককে হারিয়ে বিপাকে পড়া বাংলাদেশকে ৬১ রানের জুটিতে ঠিকই ছন্দে ফিরিয়েছেন সাকিব আর মাহমুদউল্লাহ। তবে তারা আউট হওয়ায় শেষের দিকে রানের চাকায় গতি আনতে পারেনি বাংলাদেশ।

৭ উইকেট হাতে নিয়ে শেষ ১০ ওভারে গিয়েছিল বাংলাদেশ। কিন্তু প্রত্যাশিত ঝড় তুলতে পারেননি কেউ। সৌম্য সরকার ৬, চোটের ধাক্কা সামলে ব্যাট হাতে নামা লিটন ৮ রান করে আউট হন। ১০ বলে ১০ রান করেন মেহেদী মিরাজ। ১১ বলে ৬ রানের বেশি করতে পারেননি মাশরাফি। শেষের এই ব্যর্থতাতেই প্রত্যাশিত মাত্রা পায়নি দলের পুঁজি। ৪০ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়ে ১৯১ রান তোলে ফেলা বাংলাদেশ শেষ ১০ ওভারে তুলতে পারে মাত্র ৬৪ রান। ওটাই কাল হলো।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ : ৫০ ওভারে ২৫৫/৭ (তামিম ৫০, লিটন ৮, ইমরুল ০, মুশফিক ৬২, সাকিব ৬৫, মাহমুদউল্লাহ ৩০, সৌম্য ৬, মাশরাফি ৬*, মিরাজ ১০*; রোচ ১/৩৯, থমাস ৩/৫৪, পল ১/৬৮, বিশু ১/২৭, পাওয়েল ১/৪১)

ওয়েস্ট ইন্ডিজ : ৪৯.৪ ওভারে ২৫৬/৬ (হেমরাজ ৩, ব্রাভো ২৭, সাই হোপ ১৪৬*, স্যামুয়েলস ২৬, হেটমায়ার ১৪, চেস ৯, পল ১৮*; মাশরাফি ১/৫২, মিরাজ ১/৩৯, মুস্তাফিজ ২/৬৩, রুবেল ২/৫৭)




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


খেলা ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন