এত মৃত্যু রেললাইনে!

রাজধানীর খিলক্ষেতের 'হঠাৎ মার্কেট' এলাকায় শিশুকন্যাকে নিয়ে রেললাইন পার হচ্ছিলেন জাহানারা বেগম। হঠাৎ ট্রেনের শব্দ শুনতে পান তিনি। আতঙ্কিত হয়ে তিনি মেয়ের প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তাকে ছুড়ে ফেলে দেন রেললাইনের পাশে। মেয়েকে বাঁচাতে পারলেও ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় জাহানারার। মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটে গত ৩০ জানুয়ারি।

ট্রেনের ধাক্কায় বা কাটা পড়ে প্রাণহানির এমন ঘটনা ঘটছে প্রায় প্রতিদিনই। সর্বশেষ গত ১৪ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় এ রকম দুর্ঘটনায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রসহ চারজনের মৃত্যু হয়।

রেলপথ পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সারাদেশের রেললাইনে চার হাজার ৬১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। দিন দিন বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। ২০১৫ সালে মারা গেছেন ৮২১ জন, ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৯৭১ এবং ২০১৭ সালে এক হাজার ২২ জন।

রেললাইনে মৃত্যুর একটি বড় অংশই ঘটে ঢাকা রেলপথ থানা এলাকায়। ঢাকার কমলাপুর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু ও ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত রেললাইন নিয়ে এই থানা গঠিত। ২০১৮ সালে এ এলাকার রেললাইনে ২৮২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে তেজগাঁও থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত অংশে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। গত বছর এই রেলপথ থেকে অন্তত ৯০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, যা ঢাকা রেলপথ থানা এলাকায় মোট মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এ ছাড়া রেললাইন থেকে আহত অবস্থায় উদ্ধারের পর ঢাকার তিনটি হাসপাতালে ৫৪ জন মারা গেছেন। তাদের অধিকাংশই ওই এলাকায় দুর্ঘটনার শিকার হন। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলোর আশপাশের লোকজন, রেলপথ পুলিশ, রেলওয়ের কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এসব মৃত্যুর জন্য অন্তত সাতটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাণহানি রোধ করতে রেল করিডরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ অথবা স্বতন্ত্র তলে রেললাইন স্থাপন হতে পারে কার্যকর পন্থা। রেললাইনে দুর্ঘটনার পাশাপাশি কিছু রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। দিনের পর দিন কেটে গেলেও যে রহস্য রহস্যই থেকে যায়।

রেলপথ পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মহসিন হোসেন সমকালকে বলেন, অসতর্কভাবে রেললাইন পার হতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায় বা কাটা পড়ে মৃত্যুর কিছু ঘটনা ঘটে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনে কথা বলা বা কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে থাকায় তারা ট্রেনের আওয়াজ শুনতে পান না। এসব দুর্ঘটনা এড়াতে সবার সচেতন হওয়া দরকার।

সংশ্নিষ্টরা জানান, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রেললাইনের ওপর দিয়ে চলে গেছে সড়ক। এসব লেভেল ক্রসিংয়ের কিছু রেলওয়ে অনুমোদিত। সেখানে রেল কর্তৃপক্ষের নিয়োগ করা কর্মী ট্রেন চলাচলের সময় সড়কে প্রতিবন্ধক (ধাতব বার) ফেলে রাখেন। ফলে সাধারণত ওই এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটে না। কিন্তু এর বাইরে রয়ে গেছে প্রচুর অননুমোদিত লেভেল ক্রসিং, যা দিয়ে যান চলাচল করে বা পথচারীরা হেঁটে পার হন। সেসব স্থানে পথচারী বা যানচালকদের সতর্ক করার কেউ থাকে না বলেই দুর্ঘটনা ঘটে।

রেলপথ পুলিশের তথ্যমতে, ২০১৩ সালে সারাদেশের রেললাইনে ৯০২ ও ২০১৪ সালে ৮৯৮ জন মারা যান। ২০১৮ সালের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি। তবে জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মারা গেছেন ২১৩ জন।

রেলপথ পুলিশ সদর দপ্তরের পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) নিগার সুলতানা জানান, রেললাইনে মৃত্যুর বেশিরভাগই অসাবধানতাজনিত, আর কিছু আত্মহত্যা। এ ছাড়া খুনের ঘটনাও আছে, তবে তা খুবই কম।

দুর্ঘটনার ৭ কারণ :সাম্প্রতিক দুর্ঘটনাগুলো বিশ্নেষণ, সরেজমিন অনুসন্ধান, সংশ্নিষ্টদের মত ও রেলপথ পুলিশের পর্যবেক্ষণে অন্তত সাতটি কারণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মোবাইল ফোনে কথা বলা বা হেডফোনে গান শুনতে শুনতে রেললাইন পার হওয়া অন্যতম। এ ছাড়া রয়েছে বাঁকা পথের কারণে ট্রেন দেখতে না পাওয়া, রেললাইন ধরে হাঁটা (নির্দিষ্ট দূরত্বে থাকা স্লিপারে পা ফেলতে হয় বলে সেদিকেই মনোযোগ থাকে), অসতর্ক-অন্যমনস্ক হয়ে পারাপার, আশপাশের প্রচণ্ড শব্দে ট্রেনের শব্দ শুনতে না পাওয়া, রেললাইনের পাশে দোকান বা অবৈধ স্থাপনার কারণে ট্রেন না দেখা এবং রেললাইন বা এর পাশে প্রস্রাব করতে যাওয়া। এ ছাড়া মানসিক ভারসাম্যহীন বা মাদক সেবনের কারণে 'অসুস্থ' ব্যক্তিদের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুও একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে রেলপথ পুলিশ।

ঢাকা রেলপথ থানার ওসি ইয়াছিন ফারুক মজুমদার জানান, ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মধ্যে তেজগাঁও থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত অংশে দুর্ঘটনা ঘটে সবচেয়ে বেশি।

দুর্ঘটনাপ্রবণ খিলক্ষেত :খিলক্ষেত এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রেললাইনের পাশের জমিতে গড়ে উঠেছে কিছু অবৈধ দোকানপাট, যা 'হঠাৎ মার্কেট' নামে পরিচিত। এই মার্কেটের ভেতর দিয়েই চলাচল করে অনেক মানুষ। মার্কেট থেকে বের হওয়ার মুখেই রেললাইন থাকায় তারা দূর থেকে ট্রেন দেখতে পান না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে। বেশ কয়েকটি দুর্ঘটনার পর এই অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে নিরাপত্তার উদ্যোগ নেন ব্যবসায়ীরা। ট্রেন চলাচলের সময় বাঁশ দিয়ে তৈরি প্রতিবন্ধক ব্যবহার করে মানুষের যাতায়াত বন্ধ করা হয়। এই দায়িত্ব পালন করেন মোহাম্মদ শফিক নামের এক ব্যক্তি। তিনি জানান, বাঁশের প্রতিবন্ধক ছাড়াও তিনি সাবধান করেন পথচারীদের; কিন্তু কেউ তার কথা শুনতে চায় না। ৩০ জানুয়ারি জাহানারার মৃত্যুর জন্যও ওই নারীর অসতর্কতা দায়ী।

আবু সিদ্দিক নামের স্থানীয় একজন জানান, স্থানীয়দের সুবিধার্থে তিনিই উদ্যোগ নিয়ে সরু পথটি তৈরি করেন। সকাল ৯টা থেকে ১১টা ও সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা প্রচুর লোকজন এই পথ ব্যবহার করে বনরূপা, নয়ানগর, লেকসিটিসহ আশপাশের এলাকায় যান। ব্যবসায়ীদের নিয়োগ করা 'গেটম্যান' শফিক থাকেন সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। এর আগে ও পরে বাঁশের প্রতিবন্ধক ফেলার কেউ থাকে না।

ওই পথ ব্যবহারকারী এক নারী জানান, এখানে পথচারীরা বুঝতে পারেন না ট্রেনটি কত দূরে আছে। তারা ভাবেন, ট্রেন আসার আগেই লাইন পার হতে পারবেন। কিন্তু দ্রুতগামী ট্রেন মুহূর্তেই চলে আসে। এটাই দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।

স্থানীয়রা জানান, খিলক্ষেত থেকে কাওলা পর্যন্ত রেললাইনে পাঁচটি লেভেল ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে অবৈধ তিনটি হলো- বনরূপা, খাঁ পাড়ার মোড় ও হঠাৎ মার্কেট।

কুড়িলে রেললাইনে বিপজ্জনক বাঁক :কুড়িল এলাকায় রেললাইন অর্ধচন্দ্রাকৃতির বাঁক নিয়েছে। ফলে এই পয়েন্ট থেকে অল্প দূরে থাকা ট্রেনও দেখা যায় না। এটি দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বলে মনে করেন স্থানীয়রা। এখানে রেললাইন ও সড়কের মধ্যে দেয়াল তুলে পথচারীদের পারাপারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু লোকজন ঠিকই পার হচ্ছেন।

রেললাইনের দু'পাশেই বেশ কিছু দোকানপাট রয়েছে। চা দোকানি রফিকুল ইসলাম কালু জানান, দেয়ালের কারণে লোকজন ট্রেন দেখতে পান না। ফলে রেললাইনে উঠতে গিয়েই ঘটে দুর্ঘটনা। তবে এখানকার ব্যবসায়ীরা ট্রেন চলাচলের সময় পথচারীদের সতর্ক করেন।

রফিকুলের কথা শেষ হওয়ার আগেই এক তরুণ হেডফোন কানে লাইনে উঠতে যাচ্ছিলেন, আর তখন কমলাপুর থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি ছিল খুব কাছে। ব্যবসায়ীরা হৈ হৈ শব্দ করে তাকে বাধা দেন।

ফল ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান জানান, অনেকে কুড়িলে এসে বাসে ওঠেন। তারা দূর থেকে বাস দেখে দৌড়ে আসেন। শুধু বাসের ব্যাপারে মনোযোগ থাকায় লাইন পারাপারের সময় ট্রেনের দিকে খেয়ালই থাকে না।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


বাংলাদেশ ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন