বিএনপির দলীয় সিদ্ধান্তেই এমপিরা শপথ নিচ্ছেন

নানান নাটকীয়তার পর সংসদে যোগদান করছে বিএনপি। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ১২০ দিন পর সংসদে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। হঠাৎ করে সংসদে যোগাদানের নেপথ্যে দলের চেয়ারপার্সন অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি। এ জন্যই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বিদেশে অবস্থানরত তারেক রহমান ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এমপিদের সংসদে যোগদানের পরামর্শ দেন। গতকাল ৪ এমপির শপথ গ্রহণের পর এ নিয়ে হইচই বাদ-প্রতিবাদ শুরু হলে সন্ধ্যায় সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দলীয় সিদ্ধান্তেই এমপিরা শপথ নিয়েছেন। যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় সংসদে অংশ গ্রহণ করছি। সূত্রের দাবি- বিএনপির সংসদে যোগদানে বেগম খালেদা জিয়া প্যারোলে মুক্তি পেলে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারেন। দেশে প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশে চিকিৎসা নতুন কিছু নয়। ফখরুদ্দীন-মইন উদ্দিন সরকারের শাসনামলেও প্যারোলে মুক্তি নিয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন বর্তমানের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একই সরকারের সময় চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি নিয়ে ইংল্যান্ড যান বিএনপির তারেক রহমান। এমনকি ১৯৭৮ সালে জাসদের সভাপতি আ স ম আবদুর রবকে উন্নত চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বিদেশ পাঠানো হয়েছিল।

সকল বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে দলীয় সিদ্ধান্তেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে নির্বাচিত ৪ সংসদ সদস্য শপথগ্রহণ করেন। এর আগে শপথ নেন ঠাকুরগাঁও-৩ থেকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান। ফলে একমাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ছাড়া দলটি থেকে নির্বাচিত সবাই শপথগ্রহণ করলেন। গতকাল শপথ নেয়া চারজন হলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের মো. আমিনুল ইসলাম, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের মো. হারুনুর রশীদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের উকিল আবদুস সাত্তার ভূঁইয়া এবং বগুড়া-৪ আসনের মোশাররফ হোসেন। জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বিকেল ৫টা ৪০ মিনিটে তাদের শপথবাক্য পাঠ করান। এ সময় সংসদের চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী, হুইপ ইকবালুর রহিম এবং জাহিদুর রহমান এমপি উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ৪ এমপি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করেন। বিএনপির ৪ এমপির শপথ নেয়া-না নেয়া নিয়ে বিতর্ক চললেও সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা যায়, শপথ অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিয়ে রাখা হয়েছিল। ৪ এমপি স্পিকারকে ফোন করে শপথ নেয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। আর বিএনপির মহাসচিব অসুস্থতার কথা জানিয়ে শপথ গ্রহণের সময় চেয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকারের বরাবরে আবেদন করেছেন। বেগম জিয়ার প্যারোলে মুক্তির পর তিনি শপথ গ্রহণ করতে চাচ্ছেন। বিএনপির এই ৪ এমপির শপথ নেয়া নিয়ে কয়েক দিন ধরে চলছে আলোচনা-সমালোচনা-বিতর্ক। এমনকি কারাবন্দী বেগম খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি দেয়ার শর্তে বিএনপির এমপিরা শপথ নেবেন- এমন প্রচারণা চলে আসছে অনেক দিন ধরে। তবে বিএনপি থেকে এমপিদের শপথ এবং সংসদে যাওয়ার প্রশ্নে লুকোছাপা করা হয়েছে। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী গতকাল ছিল শপথ নেয়ার শেষ দিন। এত দিন বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট শপথ নেয়ার বিপক্ষে ছিল। তাদের বক্তব্য- শপথ নেয়ার অর্থ হলো এই সংসদকে ৫ বছরের জন্য মেনে নেয়া। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে বিএনপি শপথ না নেয়ার ঘোষণা দেয়। সে কারণে গত বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল ঠাকুরগাঁও-৩ আসন থেকে নির্বাচিত বিএনপির সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমান জাহিদ শপথগ্রহণ করলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ও মিত্ররা। বিরোধী দলের নেতা হন সাবেক স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদ। বিএনপি অভিযোগ তোলে নির্বাচনের আগের রাতেই ব্যালটে সিল মেরে নৌকাকে জিতিয়ে দেয়া হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের ভাষায় এই নির্বাচনের ফলাফল হলো সরকার, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আঁতাতের ফসল। জনগণকে ভোট দিতে না দিয়ে আগের রাতেই এরা ব্যালটে সিল মেরে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করা হয়েছে। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, বিএনপির চারজন এমপি শপথ নিলে পরিস্থিতির তেমন হেরফের হবে না।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ৮টি আসন পায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচিত ৮ জনের মধ্যে ৬ জন বিএনপির, একজন গণফোরামের আর একজন নির্দলীয়। নির্দলীয় (ঐক্যপ্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত) সুলতান মোহাম্মদ মনসুর মৌলভীবাজার-২ আসন থেকে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচিত হয়ে গত ৭ মার্চ শপথ নিয়ে সংসদে যোগ দেন। ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্ত অমান্য করে শপথ নেয়ার সময় তিনি জানান ‘নির্বাচনের আগেই শপথ নেয়ার ব্যাপারে কমিটমেন্ট ছিল’। সিলেট-২ আসন থেকে গণফোরামের প্রতীক উদীয়মান সূর্য নিয়ে নির্বাচিত মোকাব্বির খানও দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে গত ২ এপ্রিল শপথ গ্রহণ করেন। তাকেও গণফোরাম থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। এমনকি এই শপথকে ইস্যু করে দলটি ভাঙনের মুখোমুখি হয়।

সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন ঠাকুরগাঁও-৩ থেকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান। এ কারণে গত শনিবার রাতে তাকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। ওই বহিষ্কারাদেশের মাধ্যমে সংসদে যোগ দেয়ার বিষয়ে মাঠের বিরোধী দল খ্যাত বিএনপি তাদের অবস্থান পরিষ্কার করে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বেগম খালেদা জিয়াকে যেকোনো সময় প্যারোলে অথবা জামিনে মুক্তি দেয়া হতে পারে। ৪ এমপি গতকাল শপথ গ্রহণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বাইরে এসে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন শপথগ্রহণকারীদের একজন হারুন অর রশীদ। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ থেকে নির্বাচিত এই এমপি বলেন, সরকারের চাপ ছিল তবে সে কারণে নয়, বরং দলীয় সিদ্ধান্ত তথা দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তে আমরা শপথ নিয়েছি। সংসদে গিয়ে দলীয় চেয়ারম্যান ও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী কারান্তরীণ খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি তুলব। দেশে সরকার থাকবে সুশাসন থাকবে না, আইনের শাসন থাকবে না এটা হতে পারে না। এখানে দলের মুখপাত্র হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা দলীয় সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ছিলাম। আসলে এ সংসদ জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছে না। জনগণের ভোটে এ সরকার নির্বাচিত হয়নি। ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন হয়নি। যে কারণে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এ নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। নির্বাচনে যে ফল মানুষ প্রত্যাশা করেছিল তা পায়নি। ভোট চুরির মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস করা হয়েছে। চুরি করে ক্ষমতায় আসার জন্য সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। এটিকে ঠিক করার দায়িত্ব সরকারের। কিভাবে জনগণের প্রতিনিধির মাধ্যমের সরকার গঠন করা যায় সে দায়িত্ব সরকারের। তিনি আরো বলেন, বিশেষ করে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া, নিম্ন আদালতের ফরমায়েশি রায়ে তাকে কারাগারে রাখা হয়েছে। অথচ দেশের ফাঁসির আসামি, মাদকের আসামির মতো জঘন্য আসামিরা জামিনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই আমরা আশা করব, সরকার অবিলম্ব খালেদা জিয়াকে জামিনে মুক্তি দেবে এবং তার সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করবে। উকিল আবদুস সাত্তার বলেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আলাপ করে তার সম্মতিতে সংসদে এসে শপথ নিয়েছি। সরকারবিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবেই সংসদে যাচ্ছি।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং দেশনেত্রীর মুক্তির দাবিতে সংসদে কথা বলার সীমিত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সংসদ ও রাজপথের সংগ্রামকে যুগপৎভাবে চালিয়ে যাওয়াকে আমরা যুক্তিযুক্ত মনে করছি। জাতীয় রাজনীতির এই সঙ্কটময় জটিল প্রেক্ষিতে বেগম খালেদা জিয়ার সুচিকিৎসা, মুক্তি এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের অংশ হিসেবে আমাদের দল সংসদে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। আশা করি, দেশবাসীকে সাথে নিয়ে আমাদের এই সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় অবিলম্বে একটি অবাধ জাতীয় নির্বাচন আদায় করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও দেশনেত্রীসহ সব রাজবন্দিকে মুক্ত করে আমরা খালেদা জিয়া ঘোষিত জাতীয় ঐকমত্যের বাংলাদেশ গড়ে তুলব।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


রাজনীতি ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন