তবে কি খালেদা জিয়া মুক্তি পাচ্ছেন?

নানা জল্পনা কল্পনা শেষে অবশেষে বিএনপির এমপিরা শপথ নিলেন। শপথ নেওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে আলোচনা। সিদ্ধান্তের নেপথ্যে কোনো কারণ আছে কিনা তা নিয়েও চলছে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা। অনেকের মনে প্রশ্ন- তাহলে কি আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপির গোপন সমঝোতা হয়ে গেলো? বিএনপির অন্যতম প্রধান দাবি অনুযায়ী কারাবন্দি দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া মুক্তি পাচ্ছেন? 'কারচুপির' অভিযোগে নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে এখন কোন সমঝোতার ভিত্তিতে সংসদে গিয়ে নির্বাচনের 'বৈধতা' দিল দলটি? নাকি দলীয় এমপিদের চাপের মুখে সংসদে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো বিএনপি? গুরুত্বপূর্ণ এই প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খাচ্ছে সবার মনে। অবশ্য নির্ভরযোগ্য সূত্র আভাস দিয়েছে, পর্দার আড়ালে শেষ মুহূর্তে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে বিএনপির একটি রাজনৈতিক 'সমঝোতা' হয়েছে। সেই সমঝোতার ভিত্তিতেই বিএনপি সংসদে যেতে পারে।

বিএনপির উচ্চ পর্যায়ের একটি সূত্র জানায়, গত এক মাস ধরে বেশ জোরালোভাবে বিদেশি কূটনীতিকরা বিএনপিকে সংসদে যোগ দিতে চাপ দিয়ে আসছেন। একই সঙ্গে তারা বলছেন, সংসদে গিয়ে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে জোরালোভাবে বক্তব্য তুলে ধরতে। খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে সরকারি দলের সঙ্গে ইতিবাচক কোনো আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে কূটনীতিকরা এ পরামর্শ দিতে পারেন বলেও মনে করেন বিএনপি নেতারা। বিশেষ করে পশ্চিমা ও প্রতিবেশী প্রভাবশালী দেশের কূটনীতিকরা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কয়েকজন নীতিনির্ধারকের কাছে সংসদে যোগ দেওয়ার ব্যাপারে নানা যুক্তি তুলে ধরেন। বিষয়টি দলের হাইকমান্ড গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে। খুব কম সময়ের মধ্যেই খালেদা জিয়া মুক্তি পাবেন বলেও বিএনপি নেতাদের আভাস দিচ্ছে ওইসব দেশের কূটনীতিকমহল।

সূত্র জানায়, সর্বশেষ রোববার বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে স্কাইপের মাধ্যমে তারেক রহমান শীর্ষ নেতাদের কাছে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুমতি চান। একইসঙ্গে শপথ নেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক মত দেন তিনি। জবাবে শীর্ষ নেতারা বলেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যান বা ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানকে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার একক ক্ষমতা দেওয়া আছে। দলের বৃহত্তর স্বার্থে তিনি যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এতে তারা দ্বিমত করবেন না। একইসঙ্গে তারা তারেক রহমানকে বলেন, শপথ না নেওয়ার ব্যাপারে বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সিদ্ধান্ত বদল করলে পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কেও সতর্ক থাকতে হবে।

বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতারা জানান, বেশ কিছুদিন ধরে তারেক রহমান শুভাকাঙ্ক্ষী প্রভাবশালী দেশি-বিদেশিদের সঙ্গেও আলোচনা করেন। কারও দূ্যতিয়ালীর মাধ্যমে তারেক রহমান ক্ষমতাসীন দলের কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে পর্দার আড়ালে লন্ডনে রাজনৈতিক সমঝোতাও করতে পারেন। হয়ত অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে আসছেন। শুধু দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। দলের স্থায়ী কমিটির সিনিয়র নেতারাও এ বিষয়ে অবগত নন। এ প্রেক্ষাপটে গতকাল সন্ধ্যায় সংসদে যোগ দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে স্থায়ী কমিটির সিনিয়র কোনো নেতাকে দেখা যায়নি। সূত্র জানায়, রাজনৈতিক 'সমঝোতা'র বিষয়টি নিয়ে তারেক রহমান দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকেও অবহিত করেন। খালেদা জিয়ার অনুমতি পাওয়ার পর দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গতকাল দুপুরে টেলিফোন করে নির্বাচিত এমপিদের শপথ নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানান। এরপর মির্জা ফখরুল দলীয় এমপিদের শপথ নেওয়ার নির্দেশনা দেন বলে জানা গেছে।

অবশ্য এরই মধ্যে তিনটি ছাড়া খালেদা জিয়া বাকি ৩৪টি মামলায় জামিন পেয়েছেন। জামিনের বাকি রয়েছে শুধু সাজাপ্রাপ্ত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা এবং ঢাকার একটি মানহানি মামলা।

বিএনপি আন্তর্জাতিক উইংয়ের একজন নেতা জানান, সম্প্রতি দেশি-বিদেশিদের তৎপরতায় মনে হচ্ছে খালেদা জিয়ার মুক্তির শর্তেই বিএনপি সংসদে যোগ দিতে পারে। তা হলে খুব শিগগির খালেদা জিয়া মুক্তি পেতে পারেন।

এ বিষয়ে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টু বলেন, আমরা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির ব্যাপারে জোর দাবি জানিয়ে আসছি। আশা করি, অসুস্থ খালেদা জিয়া শিগগির প্যারোলে নয়, জামিনেই মুক্তি পাবেন। সংসদে যোগদানের ব্যাপারে কোনো সমঝোতা হয়েছে কি-না এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশে এমপিরা শপথ নিয়েছেন। কোনো সমঝোতা হলেও সেটি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গেই হতে পারে। এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু বলেন, সারাদেশের নেতাকর্মীরা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি চান। তাকে কারাগারে রেখে বিএনপির এমপিদের সংসদে যাওয়া নেতাকর্মীরা মেনে নেবেন না। তবে খালেদা জিয়া মুক্তি পেলে সংসদে গেলে তাদের কোনো আপত্তি থাকবে না।

তবে বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতারা জানান, সমঝোতার মাধ্যমে নয়, আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমেই তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি চান। তা না হলে দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে 'ভুল বার্তা' যাবে বলেও মনে করেন এই অংশের নেতারা।

অবশ্য বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদ সম্মেলনে জানালেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন যুগপৎভাবে গড়ে তুলতে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তেই বিএনপির এমপিরা শপথ নিয়েছেন। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানালেও কেউ কেউ দলের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও নেতৃত্বের মতবিরোধ আরও দৃশ্যমান হবে বলে মনে করেন। ভবিষ্যতে দলটি আরও সংকটে পড়তে পারে বলেও শঙ্কা ব্যক্ত করেন।

অসুস্থ খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হয় প্যারোলে, না হয় জামিনে মুক্তি দেওয়ার ব্যাপারে বেশ কিছুদিন ধরে চলছে রাজনৈতিক বিতর্ক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারি দলের মন্ত্রীরাও প্যারোলে মুক্তির ব্যাপারে আবেদন করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন। তবে এ বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন বিএনপি নেতারা।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


রাজনীতি ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন