কম্পিউটারেই জীবন পার স্টিফেন হকিংয়ের

মাত্র ২১ বছর বয়সে মটর নিউরন রোগে আক্রান্ত হবার পর চিকিৎসকদের ধারণা ছিল, তিনি বড়জোর বছর দুয়েক বাঁচবেন।কিন্তু তাদের সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে আরও ৫৫ বছর বেঁচে থাকলেন স্টিফিন হকিং। অবশেষে ৭৬ বছর বয়সে কসমোলজি ও তাত্ত্বিক পদার্থ বিজ্ঞানীর জীবনাবসান হলো বুধবার।কিন্তু তার বেঁচে থাকার একটা দীর্ঘ সময় তাকে কাটাতে হয়েছে কম্পিউটার নির্ভরতার মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে ১৯৮৫ সালে যখন তিনি নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন তখন থেকেই হারিয়ে ফেলেন তার বাকশক্তি। কথা বলার জন্য তখন থেকে পুরো নির্ভরতা শুরু হয় কম্পিউটারের উপর। ১৯৯৭ সালে স্টিফেন হকিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় ইন্টেলের সহ-প্রতিষ্ঠান গর্ডন মোরের। সেটা একটা কনফারেন্সে। গর্ডন খেয়াল করেন, স্টিফেন হকিং যে কম্পিউটারটি সবার সঙ্গে যোগাযোগে ব্যবহার করছিলেন সেটি ছিল এএমডি প্রসেসরের। তখন গর্ডন হকিংকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি ইন্টেল মাইক্রো-প্রসেসরের একটি ‘প্রকৃত কম্পিউটার’ পছন্দ করবেন কিনা। সেখানে হকিংয়ের ইতিবাচক সাড়া পেলে সে বছর থেকেই ইন্টেল হকিংকে কারিগরি সহযোগিতাসহ একটি কাস্টমাইজ কম্পিউটার দেন। আর প্রতি দু বছর পরপর সেই কম্পিউটার রিপ্লেস করে দেয় ইন্টেল।১৯৮৫ সালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে জেনেভার সার্নে যখন তিনি হাসপাতালে তখন অবস্থা অনেকটাই আশঙ্কাজনক। তাকে ভিন্টিলেটর সিস্টেম দেওয়া হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি দেখে ডাক্তাররা স্টিফেন হকিংয়ের স্ত্রীর কাছে জানতে চান, তাকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া বন্ধ করে দেবেন কিনা। তার স্ত্রী সেটা প্রত্যাখান করলেন।পরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় কেমব্রিজের অ্যাডেনব্রুকস হাসপাতালে। সেখানে ধীরে ধীরে তার অবস্থার উন্নতি হতে থাকে। তবে হারিয়ে ফেলেন বাকশক্তি। তখন অন্যের সঙ্গে তার যোগাযোগ শুরু হয় চোখের পাতা ফেলে। এমনকি স্পেলিং কার্ডের মাধ্যমেও করতেন।কিছুদিনের মধ্যেই তার জন্য যোগাযোগে নতুন একটি পদ্ধতি তৈরিতে কাজ শুরু করেন পদার্থ বিজ্ঞানী মার্টিন কিং। মার্টিন তখন ক্যালিফোর্নিয়ায় যোগাযোগ করে সেখানকার প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ড প্লাস। প্রতিষ্ঠানটি কাজ করতো কম্পিউটার প্রোগ্রামিং নিয়ে। তবে সেটা কিছুটা ভিন্ন ধরনের প্রোগ্রামিং ছিল। প্রতিষ্ঠানটি ব্যবহারকারীকে শব্দ নির্বাচন করতে বলে এবং হ্যান্ড ক্লিকারের মাধ্যমে কম্পিউটারে কমান্ড নিয়ে থাকে। মার্টিন ওয়ার্ড প্লাসের প্রধান নির্বাহীর সেঙ্গ কথা বলেন। তিনি তার কাছে বলেন, তাদের সফটওয়্যারটি ইংল্যান্ডের পদার্থ বিদ্যার এক প্রফেসরকে যদি সাহায্য করতে পারে, তবে বিষয়টি ভেবে দেখতে। তিনি অ্যামায়োট্রফিক ল্যাটেরাল স্কেলেরোসিস রোগে আক্রান্ত।এর আগে একই রোগে আক্রান্ত ওয়াল্টার ওল্টজ ওয়ার্ড প্লাসের প্রধান নির্বাহীর শ্বাশুড়ির জন্য একটি সংস্করণে নিয়ে কাজ করেছেন। তখন ওয়াল্টার মার্টিনকে জিজ্ঞেস করেন, সেই ব্যক্তি কী স্টিফেন হকিং কিনা। তবে মার্টিন তখন তাকে নাম বলেননি।তবে ঠিক পরের দিনই মার্টিন ওয়াল্টারের কাছে যান এবং তার কাছে বিস্তারিত বলে কাজ শুরু করতে বলেন। এর জন্য তার যা যা প্রয়োজন হবে সবই দেওয়া হবে বলেও মার্টিন জানান।ওয়াল্টারের প্রতিষ্ঠান কাজ শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যে স্টিফেন হকিংয়ের জন্য একটি অত্যাধুনিক সফটওয়্যার তৈরি করেন।অ্যাপল ২ কম্পিউটারে প্রথম তার ইকুলাইজারটি কাজ করতে শুরু করে। এটি শুরু করে স্পিচ প্লাস নামের একটি প্রতিষ্ঠান। তবে কাজটিকে অনেকটাই গতি দেন স্টিফেন হকিংয়ের এক নার্সের স্বামী। এর মাধ্যমে হকিং প্রতি মিনিটে ১৫টি করে শব্দের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে পারেন।২০০৮ সাল থেকে হ্যান্ড ক্লিকারের মাধ্যমে হকিংয়ের যোগাযোগ অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। কারণ যে পরিমাণ শক্তি হাতে থাকার কথা, সেটা হারিয়ে ফেলেন তিনি। আর ২০১১ সালে এসে তার সেই যোগাযোগ দক্ষতা নেমে আসে প্রতিমিনিটে এক থেকে দুই শব্দে।তবে এরপর আবার ইন্টেলের বিশেষজ্ঞরা স্টিফেন হকিংয়ের সঙ্গে দেখা করেন। তার জন্য আরো উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করতে শুরু করেন। সর্বশেষ তার মৃত্যু পর্যন্ত ইন্টেলের প্রসেসরযুক্ত কম্পিউটারই ব্যবহার করেছেন।




  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত


আন্তর্জাতিক ক্যাটাগরির আরও খবর পড়ুন